১১:১৬ এম
ভারতের কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাও প্রয়াত হয়েছেন। শনিবার (৩ অক্টোবর) চেন্নাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৪ বছর বয়সে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়সজনিত নানা জটিলতায় বেশ কিছুদিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই বর্ষীয়ান নির্মাতা। তাঁর মৃত্যুর খবরটি ‘তেলেঙ্গানা টুডে’ প্রকাশ করেছে।
সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাওয়ের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করেছেন অভিনেতা বিষ্ণু মাঞ্চুসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকেই। বিষ্ণু তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা তৈরিতে এই নির্মাতার কাজের প্রভাবের কথা স্মরণ করে বলেন, সিঙ্গিতম কখনো প্রচলিত চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারা বা নির্দিষ্ট কোনো ঘরানার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে বিষ্ণু মাঞ্চু লেখেন, ‘এই শোক আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে খুব গভীর। বড় হওয়ার সময় সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাও ছিলেন আমার প্রিয় পরিচালকদের একজন। চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দিক পুরোপুরি বোঝার অনেক আগে থেকেই বিস্ময় নিয়ে তাঁর সিনেমা দেখতাম।’
আরও পড়ুন: মা হারালেন ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা পপি
তিনি আরও লেখেন, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং নিজে চলচ্চিত্রের অংশ হওয়ার পর তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়েছে। তিনি ছিলেন সত্যিকারের চলচ্চিত্রপ্রেমী। কল্পনায় ছিলেন নির্ভীক, সব সময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করতেন। কখনো নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা বা ছকের মধ্যে আটকে রাখেননি। তাঁর নির্মিত প্রতিটি চলচ্চিত্রই আমাদের কিছু না কিছু শেখায়। প্রতিটি চলচ্চিত্রই যেন একটি পাঠ্যবই।’
সিঙ্গিতমকে নিজের চলচ্চিত্রপ্রেমের অন্যতম অনুপ্রেরণা উল্লেখ করে বিষ্ণু লেখেন, ‘আমার কাছে তিনি সব সময় সেই নির্মাতাদের একজন হয়ে থাকবেন, যাঁরা আমাকে সিনেমার জাদুর প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন। আমরা একজন সত্যিকারের কিংবদন্তিকে হারালাম। তবে তাঁর সিনেমা বেঁচে থাকবে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।’
‘আদিত্য ৩৬৯’ থেকে ‘পুষ্পক বিমান’
১৯৩১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাও ছিলেন পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, সুরকার ও অভিনেতা। তিনি তেলুগু, কন্নড়, তামিল, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার সিনেমায় কাজ করেছেন। প্রায় ৬০টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন এই নির্মাতা। ভিন্নধর্মী ভাবনা ও প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে গল্প বলার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: নেপালের নাট্যোৎসবে মঞ্চস্থ হবে বাংলাদেশের ‘এ ফাদার’স স্কাই’
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি ‘আদিত্য ৩৬৯’। এই বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর ছবিটি সময় ভ্রমণের গল্প তুলে ধরে তেলুগু সিনেমায় নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল। ‘ভৈরব দ্বীপম’ ছিল লোককথানির্ভর ফ্যান্টাসি সিনেমা।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘পুষ্পক বিমান’। কমল হাসান অভিনীত এই ছবিতে প্রায় পুরো গল্পই কোনো সংলাপ ছাড়াই বলা হয়েছিল। সিনেমাটির এই ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী সিঙ্গিতমের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
কে ভি রেড্ডির সহকারী থেকে নির্মাতা
চলচ্চিত্রে সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাওয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল কিংবদন্তি পরিচালক কে ভি রেড্ডির সহকারী হিসেবে। সেই সময় তিনি ‘মায়াবাজার’ (১৯৫৭) ও ‘জগদেকা বীরুনী কথা’ (১৯৬১)-এর মতো সিনেমায় কাজ করেন।
আরও পড়ুন: সাত বছরেই ১২ ভাষায় দক্ষ গজনি অভিনেত্রীর মেয়ে, ঘরে নেই টিভি-মোবাইল!
১৯৭২ সালে তেলুগু চলচ্চিত্র ‘নীতি নিজায়িতি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর একের পর এক ভিন্নধর্মী সিনেমা নির্মাণ করে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।
সামাজিক বাস্তবতাকেও তাঁর সিনেমায় গুরুত্ব পেয়েছে। ‘দিক্কাত্র পার্বতী’ (১৯৭৪) তামিল ভাষার সেরা ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। ‘থারাম মারিন্দি’ (১৯৭৭) অর্জন করে নন্দী পুরস্কারের সেরা ফিচার ফিল্মের সম্মাননা।
নব্বই পেরিয়েও ছিলেন চলচ্চিত্রে
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাও দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পাঁচটি নন্দী পুরস্কার ও তিনটি কর্ণাটক রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালে ফিল্ম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া তাঁকে আজীবন সম্মাননা দেয়।
আরও পড়ুন: জাফর পানাহির ৫ বছরের কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ
নব্বইয়ের কোঠায় পৌঁছেও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই নির্মাতা। তাঁর সর্বশেষ পরিচালিত সিনেমা ‘সিঙ্গিতম’। ছবিটি প্রযোজনা করেছেন ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’খ্যাত নির্মাতা নাগ অশ্বিন।
সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাওয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোক প্রকাশ করেছেন তাঁর ভক্ত ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। একজন লিখেছেন, ‘এক কিংবদন্তি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সৃষ্টিশীল নির্মাতা সিঙ্গিতম শ্রীনিবাস রাও আর নেই। তাঁর সিনেমা চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।’ অন্য একজন লিখেছেন, ‘কিংবদন্তি, শান্তিতে থাকুন। আপনি আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন