০৫:৪৪ পি.এম
উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ সংঘাতময় ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও সমাজে বিভাজনের বিভিন্ন রূপ এখনও বিদ্যমান রয়েছে। রাজধানী বেলফাস্টে সাম্প্রতিক সময়ের সহিংসতা অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন মাত্রার উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বেলফাস্টে অভিবাসী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। মুখোশধারী কয়েকটি দল শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালানোর পর অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী: সুবিধাবাদী গোষ্ঠী রাজনৈতিক স্বার্থে বিভক্তির চেষ্টা করছে
সহিংসতার সূত্রপাতকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনায় একজন সুদানি নাগরিকের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরে ওই রাতেই বেলফাস্টের কয়েকটি এলাকায় মুখোশধারী একটি দল ঘুরে ঘুরে বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দেয়। পাশাপাশি জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরদিন বুধবারেও বিচ্ছিন্নভাবে অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা এখন দেখাচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ডের মন্ত্রী হিলারি বেন এসব হামলাকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী তৎপরতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে অবস্থানকারী তওয়াসুল মোহাম্মদ ২০১৬ সালে সুদান থেকে শরণার্থী হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘অনেক নারী ও শিশু ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে আছেন। আমরা আমাদের সন্তানদের ঘরেই রেখেছি। এসব ঘটনার পর থেকে আমি আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠাইনি।’
আরও পড়ুন: ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে সহিংসতা ঠেকাতে কারফিউ জারি
তওয়াসুলের মতে, যারা যুদ্ধ ও সংঘাত থেকে বাঁচতে নিজেদের দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন, তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি পুরোনো দুঃসহ স্মৃতি আবার ফিরিয়ে এনেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের দেশে অবস্থান নিয়ে আবাসন সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার সংকট তৈরি করিনি। অভিবাসীরা কোনো সমস্যা নয়। আমরা সবাই এই সমাজের অংশ হতে চাই এবং এর উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।’
এদিকে, বার্তা সংস্থা আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদান থেকে আসা তিন সন্তানের মা জেইনাব তার বাড়ির কাছে পূর্ব বেলফাস্টে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর আতঙ্কিত হয়ে একটি এনজিও—আনাকা উইমেনস কালেকটিভের সহায়তা চান নিরাপদ স্থানে পরিবারকে সরিয়ে নিতে।
তিনি জানান, অন্য অনেক বর্ণবাদী হামলার শিকার মানুষের মতো তিনিও বর্তমানে বেলফাস্টের বাইরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন। জেইনাব বলেন, ‘এখানে আমরা অনুভব করেছি যে এখানে সবাই বিদেশিদের অপছন্দ করে না। এখনও অনেক ভালো মানুষ আছেন—যারা আমাদের ভালোবাসেন, নিজেদের ঘর আমাদের জন্য খুলে দিয়েছেন। তারা আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভাগ করে নিয়েছেন। দুর্বল মুহূর্তে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং আমাদের আশ্রয়ও দিয়েছেন।’
সরকারি খাতের শ্রমিক ইউনিয়ন ইউনিসনের আঞ্চলিক সচিব প্যাট্রিসিয়া ম্যাককিওন জানান, সহিংসতার আশঙ্কায় অন্তত ৩০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফ্রান্সের দাঙ্গা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রকাশ
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু এলাকায় স্বঘোষিত পাহারাদার দল রাস্তায় মানুষের পরিচয় যাচাই করছে। বিশেষ করে হাসপাতালের বাইরে কর্মীদের থামিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া, ভিডিও ধারণ করা এবং তাদের অনুসরণ করার ঘটনা ঘটছে।
ম্যাককিওন বলেন, ‘গত রাতে শহরের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় হাসপাতালে চার মুখোশধারী ব্যক্তি এক নার্সকে ধাওয়া করেছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’
তবে, সহিংসতার মধ্যেও অনেক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিন বছর আগে ভারত থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে আসা রুচিরা রঙ্গপ্রসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহের ঘোষণা দিলে ব্যাপক সাড়া পান।
তিনি জানান, ৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক খাদ্য বিতরণে সহযোগিতা করেছেন। গত বুধবার কয়েক ডজন খাদ্য প্যাকেট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইয়েমেনে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৫৩ সেনা নিহত
রুচিরা বলেন, মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু খাবার একটি মৌলিক প্রয়োজন, বিশেষ করে পুষ্টিকর ঘরে তৈরি খাবার। তাই আমি ভেবেছি, রান্না করে মানুষকে সাহায্য করি।’
বেলফাস্ট ইসলামিক সেন্টারের নির্বাহী কমিটির সদস্য কাশিফ আকরাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সহিংসতা হৃদয়বিদারক হলেও এটি পুরো বেলফাস্টের চিত্র নয়।’ তিনি, জন্মসূত্রে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা আকরাম বলেন, ‘বেলফাস্টে অনেক ভালো মানুষ আছেন। যারা এখন ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তারা সংখ্যায় খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে তারাই সংখ্যালঘু।’
প্রসঙ্গত, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংঘাত ‘দ্য ট্রাবল্স’ নামে পরিচিত, যা ১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৮ সালের ‘গুড ফ্রাইডে’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়। মূলত যুক্তরাজ্যে থাকা বা না থাকার বিষয় নিয়ে আয়ারল্যান্ডের এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের দুটি প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধ ছিল। তাদের মধ্যে ইউনিয়নবাদী বা প্রোটেস্ট্যান্ট, যারা নিজেদের ব্রিটিশ মনে করে এবং যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকতে চেয়েছিল। অপরদিকে জাতীয়তাবাদী বা ক্যাথলিক- যারা আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড গঠন করতে চেয়েছিল।
প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই সংঘর্ষে আধা-সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত বোমা হামলা, হত্যাকাণ্ড ও সংঘাত ঘটেছে। এতে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সবশেষ ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির ফলে উভয় পক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করেছে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকার গঠিত হয়।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কে ‘পেইড পিরিয়ড লিভ’ সামিটে মাইনুল ইসলাম সম্মাননা পেলেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন