০৭:১৯ পি.এম
গাইবান্ধার ‘এক টাকার শিক্ষক’ লুৎফর রহমান রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেছেন, যিনি দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতীকী এক টাকা সম্মানীতে পড়িয়ে আসছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সোমবার (৫ অক্টোবর) আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লুৎফর রহমানের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে লুৎফর রহমানও এই সম্মাননা পেয়ে গর্বিত গাইবান্ধাবাসী। তাঁর এই সাফল্যে পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে লুৎফর রহমান নিজের স্বভাবসুলভ বাচনভঙ্গি ও আঞ্চলিক ভাষায় বক্তব্য দেন। শিক্ষার্থীদের বিষয় বুঝিয়ে না দিয়ে মুখস্থ করানোর প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি নিজের পাঠদানের পদ্ধতির কথাও তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী: সংসদে বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের প্রতিনিধি রাখার পরিকল্পনা
শিক্ষামন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে পাঠদান করে আসা এই শিক্ষাব্রতীকে শিক্ষক দিবসে বিশেষ সম্মান জানিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর আজীবন নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ অবসরভাতা দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছেন।
লুৎফর রহমানের এই অর্জনের খবর তাঁর নিজ এলাকা গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ায় স্থানীয়রা মনে করছেন, তাঁর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত হলো।
গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিসুজ্জামান মনা বলেন, ‘স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা এই নির্লোভ মানুষটিকে বারবার তুলে এনেছেন। তবে সম্মাননা পেয়েছেন তিনি নিজের যোগ্যতায়। এই সমাজে বিশাল ডিগ্রিধারীদের পেছনে ফেলে সামান্য লেখাপড়া জানা এই সহজ-সরল মানুষটি শিশুদের মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থবিত্ত নয়, তিনি শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলেছেন।’
লুৎফর রহমানের স্ত্রী লতিফুন বেগম বলেন, ‘কোনো কিছুর আশা না করেই এই বয়সেও মানুষটা পুরনো সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছেলেমেয়েদের হাতে খড়ি দিয়েছেন। অসুখ-বিসুখে শরীর চলে না। তারপরও বাড়ির আঙিনায় দুই-চার দফা করে পড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী গ্রামের এই পড়াপাগল মানুষটাকে ভালোবাসা দিয়েছেন। আমরা আর কিছু চাই না।’
আরও পড়ুন: চাঁদপুরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে মতবিনিময় সভা
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সাল থেকে লুৎফর রহমান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসছেন। অর্থের অভাবে যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের কাজ। নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলা এই শিক্ষাসেবা সময়ের সঙ্গে তাঁকে গাইবান্ধায় ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন না করেও দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন লুৎফর রহমান। তাঁর কাছে পড়েছে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থী। এক টাকার বিনিময়ে পড়ানোর এই উদ্যোগ শুধুমাত্র স্বল্প খরচে শিক্ষা দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবাকে বিশেষ ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সম্মাননাপ্রাপ্ত ১০২ জন শিক্ষকের তালিকায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার পাশাপাশি বিশেষভাবে অবদান রাখা শিক্ষাব্রতীরাও ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ৪ অক্টোবর দৈনিক কালের কণ্ঠের শেষ পাতায় লুৎফর রহমানকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
আরও পড়ুন: ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ শুরু ১৬ নভেম্বর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন