০১:৫৮ পি.এম
কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুপাশে সারি সারি দেবদারু ও বাহারি ফুল গাছের মাঝখান দিয়ে পাকা সরু রাস্তা ধরে সামনে এগোলে চোখে পড়ে ফলদ ও বনজ বৃক্ষের উদ্যান। চারদিকে বহুতল ভবন, পশ্চিমে বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল পুকুর ও মসজিদ এবং উত্তরে সারিবদ্ধ আবাসিক ভবন রয়েছে।
প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে এটি কোনো বিনোদনকেন্দ্র বা মনোরম রিসোর্ট। তবে প্রধান ফটকের বামে ঝোলানো জরুরি বিভাগের সাইনবোর্ড ও রোগীদের ভিড় দেখলেই সেই ভুল ভেঙে যাবে। এখানে হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কথা বলা হচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে এই হাসপাতালের বাহ্যিক চিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। অত্যন্ত নান্দনিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবে পরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটলেও বর্তমানে চরম জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত চিকিৎসকেরা।
আরও পড়ুন: পার্বতীপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়কে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. শাফির প্রচেষ্টায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ৩৮ বছর পর ২০২২ সালে প্রথমবার এই হাওরাঞ্চলে বিনা মূল্যে প্রসূতিদের অস্ত্রোপচার (সিজার) চালু করা হয়। কিন্তু স্থায়ী অ্যানাস্থেসিয়া ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ (শল্য চিকিৎসক) না থাকায় বর্তমানে নিয়মিত এই সিজারিয়ান কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৩১ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১২ জন কর্মরত আছেন। অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মরিয়ম আক্তার এক বছরের বেশি সময় ধরে জেলা সদরে প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন এবং নেই কোনো গাইনোকোলজিস্টও। একইভাবে ৩১ জন নার্স ও বয়ের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৬ জন (যার মধ্যে ৩ জন প্রেষণে)। মাঠপর্যায়ে ২০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ জন (যার মধ্যে ২ জন সাময়িক বরখাস্ত)। এছাড়া একমাত্র স্বাস্থ্য পরিদর্শকের পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
এত সমস্যার মধ্যেও হাসপাতালটির নতুন ভবনের নিচতলায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং দ্বিতীয় তলায় শিশুদের উপযোগী নান্দনিক ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ গড়ে তোলা হয়েছে। নানা রঙের খেলনা, পুতুল, দাবা বোর্ড ও রঙিন কাগজের ফুলের ব্যবহারে সাজানো মনমুগ্ধকর এই সেবাকেন্দ্রগুলো স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
পাশাপাশি বর্তমান এই কর্মকর্তার যোগদানের পর রোগীদের সুবিধার্থে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম ও জিন এক্সপার্ট ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্র বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় নিয়মিত এগুলোর সুফল মিলছে না।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ১৫ জন আসামী গ্রেফতার
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অপ্রতুলতার মধ্যেও প্রতি মাসে গড়ে চার থেকে পাঁচটি সিজার, পাঁচ শতাধিক ভর্তি রোগী, ১ হাজার জরুরি রোগী এবং প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে সেবা নিচ্ছে। প্রায় সোয়া লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই জনপদে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট না থাকায় বিপুল পরিমাণ রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হাঁপিয়ে উঠছেন চিকিৎসকেরা। তাই শূন্য পদগুলোতে দ্রুত পদায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রোববার বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা ঘাগড়া ইউনিয়নের আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, কম টাকায় ভালো চিকিৎসার আশায় এখানে আসি।’ কাটখাল ইউনিয়নের হোসেন আলী বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ এত সুন্দর হতে পারে, তা অন্য কোথাও দেখিনি। টাকা ছাড়াও হাসপাতালে সিজার হয়, তা আমরা জানতাম না। সরকার যদি প্রয়োজনীয় জনবলের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমাদের আর চিকিৎসার জন্য শহরে দৌড়াতে হতো না।’
এ বিষয়ে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল শাফি বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিরলস কাজ করছি। জনবলসহ নানা সংকট সত্ত্বেও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিতে সচেষ্ট। সংকট কাটলে হাওরবাসীকে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে কর্মকর্তাদের কিছুটা অনীহা রয়েছে। তবে এই সংকট থাকবে না, কারণ ইতিমধ্যে সরকার স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে লোকবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। দ্রুত প্রসূতি সেবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট পদায়ন করা হবে।’
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম জামায়াতে আমির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
এমএইচ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন