০৪:১২ এম
বাংলাদেশে তীব্র গরমের কারণে শ্রমের উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিপুল কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে দেশের অর্থনীতির আনুমানিক ১৩০ কোটি থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হবে। আর এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
‘আ লিভেবল ফিউচার : প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের রাজধানী ঢাকা। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে প্রতিবছর ঢাকায় মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যকরভাবে নষ্ট হচ্ছে, যা চার লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান বা চাকরির সমপরিমাণ।
আরও পড়ুন: রিজভী: বিএনপি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে, এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ
বিদ্যমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে এই ক্ষতির পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশি বাড়বে। তখন ঢাকা শহরের মোট উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার প্রায় ৭.৪ শতাংশই চরম গরমের কারণে নষ্ট হবে।
গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, দিনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে উৎপাদনশীলতার ক্ষতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনটিতে শুধু যে বাংলাদেশকে নিয়ে করা হয়েছে তা কিন্তু নয়, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা জুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কীভাবে শ্রমিক, ব্যবসা, অবকাঠামো, জনসেবা এবং নগর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে।
২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় ২৮০ মিলিয়ন কর্মক্ষম মানুষ যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য এই দেশগুলোর শহরগুলোকে চরম তাপ থেকে রক্ষা করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আরও পড়ুন: বগুড়ার অবকাঠামো খাতে মেগা উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চরম গরম একটি বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। চরম গরমের কারণে এই অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থার যদি কোনো পরিবর্তন না ঘটে, ২০৫০ সালের মধ্যে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে প্রায় ৭ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে আরও বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে, প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের সম্মুখীন হতে পারে, যা আজকের তুলনায় চারগুণ বেশি।
প্রতিবেদনটিতে পূর্বাভাসে এটাও উঠে এসেছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে ২৮ কোটি কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে যুক্ত হবেন। ঠিক সেই সময়ে তীব্র তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ও কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্বব্যাংক জানায় যে, তাপজনিত কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার এই সংকট সমাধান না হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, সঠিক ও লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে এই সংকট কাটানো সম্ভব। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং কারখানার পরিবেশ উন্নত করতে ২০১৬ সালে সরকার গঠিত ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ অল্প কয়েকটি কারখানা থেকে শুরু হয়ে আজ পুরো খাতজুড়ে ইতিবাচক রূপান্তর এনেছে।
‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। আর শ্রীলঙ্কায় এই মৃত্যুর হার বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
আরও পড়ুন: মাদানীর ওয়াজ মাহফিলে এমপিকে পাগড়ি পরিয়ে দিলেন আলেমরা
প্রতিবেদনটিতে জোর দিয়ে বলা হয়, চরম গরম ইতোমধ্যেই শ্রম উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এবং এ অঞ্চলের শহরগুলোর প্রতিযোগী সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জাতীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন নিম্নআয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ।
প্রতিবেদনটিতে তাপ সহনশীলতাকে একটি মৌসুমী জরুরি অবস্থা হিসেবে না দেখে উন্নয়নের একটি মূল অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করার আহবান জানানো হয়েছে। এতে এমন কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে যা সরকারগুলো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তাপ-সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, তাপ কর্ম পরিকল্পনা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষা, টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ একত্রিত করা।
দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো ইতোমধ্যেই প্রমাণ করছে যে, এই সমাধানগুলোর অনেকগুলোই জীবন বাঁচাতে, জীবিকা রক্ষা করতে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে পারে। এগুলো ব্যাপক প্রয়োগ এই অঞ্চলকে আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং বাসযোগ্য শহর গড়তে সাহায্য করতে পারে, পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগও সুরক্ষিত রাখতে পারে।
আরও পড়ুন: ভালো ফল অর্জন করলেই হবে না, সুনাগরিক হতে হবে: বিসিসি প্রশাসক শিরিন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন