১১:১২ এম
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সাবেক ফক্স নিউজ সাংবাদিক ক্যাথরিন হেরিজের জরুরি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এর ফলে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, হেরিজ যদি তার গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ না করেন, তাহলে তাকে প্রতিদিন ৮০০ ডলার করে জরিমানা দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট এই সিদ্ধান্ত দেয়। এর ফলে, হেরিজের বিরুদ্ধে আগে দেওয়া জরিমানার আদেশ কার্যকর হওয়ার পথ খুলে গেল। ক্যাথরিন হেরিজ দীর্ঘদিন থেকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত। ২০১৭ সালে, তিনি ফক্স নিউজে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে তালেবানের হামলায় ১ নিহত, ৫ আহত
এই প্রতিবেদনে চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী ইয়ানপিং চেনের সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ভার্জিনিয়ায় চেন প্রতিষ্ঠিত একটি পেশাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে তিনি চীনা সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করছিলেন কি না, তা তদন্ত করছে এফবিআই।
দীর্ঘ তদন্তের পরেও, ইয়ানপিং চেনের বিরুদ্ধে কখনো কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়নি। পরে, চেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার অভিযোগ, তদন্ত-সংক্রান্ত গোপন নথি ফাঁস হওয়ার কারণে সংবাদমাধ্যমে তার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়। এতে তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘৃণামূলক চিঠি এবং প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন। চেনের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেসি আইন লঙ্ঘন করে তার ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। ওই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য তার অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা যায় না।
মামলার শুনানিতে, চেনের আইনজীবীরা দাবি করেন, হেরিজের প্রতিবেদনে এমন কিছু তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যা তদন্ত-সংক্রান্ত গোপন নথি থেকে ফাঁস হয়েছিল। এসব তথ্যের মধ্যে ছিল এফবিআইয়ের একটি সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ, চেনের ব্যক্তিগত ছবি, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নথির তথ্য এবং এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনার তথ্য। আদালত হেরিজকে তার তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশের নির্দেশ দেয়, যাতে জানা যায় কে এই তথ্য ফাঁস করেছে।
আরও পড়ুন: রিজভী: বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দিয়েছিল আওয়ামী সরকার
ওয়াশিংটনের মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক ক্রিস্টোফার কুপার রায় দেন যে, নিজের মামলা পরিচালনার জন্য তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানা চেনের অধিকার, সাংবাদিকের তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার অধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, হেরিজ শপথ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেন। তবে তিনি তার কোনো গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর, আদালত তাকে দেওয়ানি আদালত অবমাননার দায়ে দোষী ঘোষণা করে। পাশাপাশি নির্দেশ দেয় যে, তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশ না করা পর্যন্ত তাকে প্রতিদিন ৮০০ ডলার করে জরিমানা দিতে হবে। পরে, এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেন হেরিজ।
আপিল আদালতও আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর, তিনি সুপ্রিম কোর্টে জরুরি আবেদন করেন। এর আগে, প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সাময়িকভাবে জরিমানার আদেশ স্থগিত করেছিলেন, যাতে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, সেই স্থগিতাদেশ আর বহাল রাখা হবে না।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ জরিমানা স্থগিত রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি সেই মত সমর্থন করেননি।
আরও পড়ুন: দুর্লভ ডাইনোসর ‘জোডি’ ৪৭.৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি, বিজ্ঞানীদের অসন্তোষ
ফক্স নিউজ মিডিয়া আদালতের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, সাংবাদিকদের গোপন তথ্যদাতার পরিচয় রক্ষা করা এবং সংবাদ সংগ্রহের প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের এই সিদ্ধান্তে তারা গভীরভাবে হতাশ। তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধিকার রক্ষার জন্য তারা লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও জানিয়েছে। হেরিজের আইনজীবীরা তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের আশঙ্কা, সাংবাদিকদের যদি গোপন তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য প্রকাশে আগ্রহী অনেক মানুষ সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিতে ভয় পাবেন।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রিপোর্টার্স কমিটির ফর ফ্রিডম অব দ্য প্রেসের সভাপতি ব্রুস ব্রাউন বলেন, সংবিধানে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আদালতে লড়াই করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, তথ্যদাতার পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা হলে জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, চেনের আইনজীবীদের দাবি, তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানার জন্য তারা অন্য সব সম্ভাব্য উপায় ব্যবহার করেছেন। কিন্তু সফল হননি। তাদের মতে, প্রাইভেসি আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ করতে তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চেনের আইনজীবী অ্যান্ড্রু ফিলিপস জানান, সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের ফলে মামলার নিষ্পত্তির পথ আরো সহজ হবে বলে তারা আশা করছেন। তিনি বলেন, ড. ইয়ানপিং চেনও অন্য সব মার্কিন নাগরিকের মতো সেই সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় জানার অধিকার রাখেন, যিনি নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করেছেন। এমন বেআইনি ও অনৈতিক কাজ ঠেকাতেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রাইভেসি আইন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন নির্বাচনে নাগরিকত্ব ছাড়াই ভোট দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে মামলা
উল্লেখ্য যে, ক্যাথরিন হেরিজ আগে ফক্স নিউজ ও সিবিএস নিউজে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন