০৩:০১ পি.এম
অর্থ সংকটে আটকে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের ভাঙা-বরিশাল-কুয়াকাটা রেলপথ প্রকল্প। ২১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা চূড়ান্ত হলেও মেলেনি কোনো বড় বিনিয়োগকারী।
অন্যদিকে, প্রায় ৮ বছর আগে জমি অধিগ্রহণের তালিকায় থাকা ঘরবাড়িতে রেল কর্মকর্তাদের দেয়া লাল নম্বরের কারণে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। সব ধরনের সংস্কার ও জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখনো তাৎক্ষণিকভাবে মেলেনি ক্ষতিপূরণের টাকা। ফলে থমকে গেছে পায়রা বন্দরকে রাজধানীর সাথে যুক্ত করার মহাপরিকল্পনা।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রেলপথটি বরিশাল জেলার গৌরনদী, উজিরপুর, বরিশাল বিমানবন্দর, বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর এবং মহানগরীর সাগরদী ও টিয়াখালী এলাকা ছুঁয়ে কীর্তনখোলা নদী অতিক্রম করবে। এরপর এটি দপদপিয়া হয়ে বাকেরগঞ্জ ও পটুয়াখালীর দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষ হবে কুয়াকাটায়। এই রুট ম্যাপের আওতায় বরিশাল নগরীর টিয়াখালী ও দক্ষিণ সাগরদীসহ প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকার হাজারো বাসিন্দা এখন এক প্রকার অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, আতঙ্কে এলাকাবাসী
রেললাইনের জমিতে নাম ওঠায় শেষ বয়সে বিপাকে পড়েছেন মহানগরীর টিয়াখালী এলাকার বৃদ্ধ সুলতান খান। তিনি বলেন, '৮ বছর আগে তার একতলা ভবনের দেয়ালে লাল রঙ দিয়ে নম্বর লিখে দিয়েছে রেলের লোকেরা। বলা হয়েছে, এখানে নতুন কোনো স্থাপনা করা যাবে না, বাড়ি মেরামত বা বিক্রিও করা যাবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'শেষ বয়সে এসে সন্তানদের সাথে ঢাকায় থাকতে চান। তাই প্রয়োজন হলে নিজের বসতভিটাসহ পাঁচ শতাংশ জমি বিক্রি করতে চাইলেও তা পারছেন না।'
একই সংকটে পড়া টিয়াখালী আরেক বাসিন্দা গৃহিণী রাবেয়া বেগম বলেন, 'বর্ষায় ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। রেলের নিষেধাজ্ঞার কারণে পাকা বা টেকসই কোনো সংস্কার করতে পারছি না।'
দক্ষিণ সাগরদীর বাসিন্দা সাবেক ব্যাংক কর্মচারী মো. আমজাদ হোসেন জানান, মেয়ের বিয়ের খরচের জন্য পৈতৃক জমির ১৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্রেতারা এসে যখনই দেখে ঘরবাড়িতে লাল রংয়ের নম্বর দেয়া, তখনই ফিরে যায়। তাই বাধ্য হয়ে ধার করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে বিজয়া দশমী: ব্রহ্মপুত্রের কাচারী ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি
ফরিদপুরের ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৫ হাজার ৬০০ একর জমির মহাপরিকল্পনায় ১৯টি স্টেশন ও ১টি জংশন সমৃদ্ধ এই মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছিল ৪১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে বার্ষিক ভিত্তিতে কাজ ঝুলে থাকায় এই ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
সরকারি বরিশাল হাতেম আলী কলেজের অধ্যক্ষ অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, 'যেকোনো মেগা প্রকল্প দীর্ঘায়িত হলে তার প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় আর ঠিক থাকে না। মুদ্রাস্ফীতি, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাড়ার কারণে এই ৪১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল।'
প্রকল্পের এরকম ধীরগতি এবং স্থানীয়দের ভোগান্তি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, 'পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য লাইফলাইন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, 'মানুষকে আশার বাণী শুনিয়ে অর্থ সংকটের অজুহাত দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ তাদের নিজেদের জমি ব্যবহার করতে পারছে না, এটি চরম অন্যায়। আমরা দাবি জানাচ্ছি, দ্রুত অর্থ সংস্থান করে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক, না হলে লাল নম্বর তুলে দিয়ে মানুষকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সুযোগ করে দেয়া হোক।'
আরও পড়ুন: নোয়াখালীতে অটোরিকশা চালকের রহস্যজনক মৃত্যু
রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই রেলপথটি নির্মাণ কাজ ২০২২ সালে শুরু হয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০২৯ সালে। তবে ২১৫ কিলোমিটারের এই বিশাল প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বড় কোনো অর্থ সহায়তা বা ঋণের ওপর। উন্নয়ন সহযোগী না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ আগেই শেষ হয়েছে। তবে এটি একটি বিশাল বাজেটের মেগা প্রকল্প। বর্তমানে অর্থ সংকটে প্রকল্পটি আটকে আছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন