০৫:১৭ এম
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় চলতি জুলাই মাসজুড়ে একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং উদ্বেগ বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এসব ঘটনার মধ্যে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার, মূল্যবান মালামাল এমনকি গুরুত্বপূর্ণ জমিজমার দলিল পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, বর্ষাকালে বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঘটনা বাড়লেও জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায়, ২৬ জুলাই গভীর রাতে বাবুগঞ্জ কলেজ গেট এলাকার খান স্টোরস নামে একটি মুদি দোকানে দুর্বৃত্তরা টিনের চাল কেটে প্রবেশ করে। সেখান থেকে তারা ক্যাশ কাউন্টার ভেঙে নগদ অর্থসহ প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। দোকানের মালিক মোশারফ হোসেন খান বলেন, "বাবুগঞ্জ থানার মাত্র কয়েকশ গজের মধ্যে এমন ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। আমরা ব্যবসায়ীরা এখন আতঙ্কে আছি।" এর আগে, ১৯ জুলাই রাতে কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভুতেরদিয়া নতুন চর এলাকায় সুমন হাওলাদারের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকাতরা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কারসহ তিন লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে। ২৪ জুলাই গভীর রাতে উপজেলার দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের মনির তামিদার, কবির তামিদার, কালাম হাওলাদার ও রুবেল মল্লিকের বাড়িতে সিঁধ কেটে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। এরপর তারা নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার এবং অন্যান্য মূল্যবান মালামাল নিয়ে যায়। চলতি মাসে কেদারপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে তালুকদার বাড়ি থেকে পুরোনো ও মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী চুরি হয়েছে। ওই সময় বাড়িতে কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। ২৩ জুলাই কেদারপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এক সাবেক সচিবের বাড়ির সামনের সাইক্লোন সেন্টারের পানির ট্যাংকের লোহার ঢাকনা চুরি হয়।
১৭ জুলাই রাতে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ফয়সাল মুন্সির বাড়িতে সিঁধ কেটে দুর্বৃত্তরা নগদ অর্থ এবং মূল্যবান মালামাল চুরি করে। এরও আগে ৯ জুলাই কেদারপুর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা কামাল হাওলাদারের ভাই এবং বাবুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলামের বাড়িতে দুর্বৃত্ত চুরি করে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, চোরেরা নগদ অর্থ, মূল্যবান মালামাল এবং গুরুত্বপূর্ণ জমিজমার দলিলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ মিনিটে ডেঙ্গুতে যুবকের মৃত্যু
ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে; অধিকাংশ ঘটনাই গভীর রাতে সংঘটিত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিঁধ কাটুন অথবা টিনের চাল কেটে ঘরে বা দোকানে প্রবেশ করা হয়েছে। নগদ অর্থ এবং স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্রও চুরি হয়েছে। একই মাসে উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে একই ধরনের কৌশলে চুরির ঘটনা ঘটেছে, যা সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয়রা মনে করছেন, বর্ষাকালে রাতের নির্জনতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে ঘটনার মধ্যে মিল থাকলেও সব অপরাধ একই চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পুলিশের বক্তব্যে বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান হাওলাদার বলেন, "ইদানীং বর্ষাকাল হওয়ার কারণে কিছু এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটছে। সারাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঘটনা হচ্ছে। প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে আমরা কাজ করছি। আগের চেয়ে পুলিশের তৎপরতা এবং রাতের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।" এ বিষয়ে বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলাউল হাসান বলেন, "বাবুগঞ্জে সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলো আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে। ইতোমধ্যে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং রাতের টহল জোরদার করা হয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"
অপরদিকে, বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলা প্রশাসন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। চুরি-ডাকাতির ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "এক মাসে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ইউনিয়নে চুরি ও ডাকাতির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিটি ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা, বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি রাতের টহল আরও জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং এবং জনসচেতনতা বাড়ানো সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। জনগণের জানমাল সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা আশা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনবে এবং নিয়মিত টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করবে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে।"
আরও পড়ুন: পীরগঞ্জের ইউএনওর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে ক্ষোভ
অত্র ঘটনায় সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি ফেরানোর চেষ্টা চলছে। একের পর এক চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় বাবুগঞ্জের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের বাসিন্দারা রাত জেগে নিরাপত্তা রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছে, অনেকেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। তাদের দাবি, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে জনমনে বিরাজমান আতঙ্ক আরও বাড়বে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুলিশের নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাবুগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন