০৮:৫৪ এম
‘মাদরাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে যাচ্ছে’, ৯ বছরের শিশু তাসফিয়ার এমন কথাই হয়ে রইল তার জীবনের শেষ কথা। স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে মাদরাসায় ভর্তির কথা বলে শিশুটিকে করতোয়া নদীতে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার সৎ বাবার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত সৎ বাবা সাফিউল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ২০ আগস্ট গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত সাফিউল ইসলাম দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ভর্ণাপাড়া এলাকার মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। শিশু তাসফিয়ার মৃত্যুর পর সে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিল।
পুলিশের তথ্যমতে, রাতের অন্ধকারে রাণীগঞ্জ বাজার থেকে ভ্যানে করে কবিরপুর, তার পর গোবিন্দপুর হয়ে মুসিপাড়ার ঘাট পর্যন্ত যায় সাফিউল। এরপর নদীর বাঁধ ধরে ভর্ণাপাড়া টঙ্গী ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন করতোয়া নদীতে নৌকা নিয়ে প্রবেশ করে। সে সময় রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে ছিল। নৌকা নদীর মাঝামাঝি পৌঁছালে তাসফিয়াকে পানিতে ফেলে দেয় সাফিউল। কিছুক্ষণ পর শিশুটির প্রতি মায়া অনুভব হলে সে তাকে নিয়ে আবার নৌকায় উঠায় এবং বুকে জড়িয়ে ধরে। এরপর নৌকা নিয়ে তীরে ফিরে আসে।
আরও পড়ুন: জিয়ানগরে ইউপি নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল জলিল শেখের সমর্থকদের নিয়ে জনসংযোগ ও পথসভা
কিন্তু তীরে ফেরার পর মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে সাফিউলের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার মধ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাসফিয়াকে তীরের কাছে নদীতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় সে। এরপর করতোয়ার কালো পানিতে শিশুটি হারিয়ে যায়।
পরদিন সোমবার সন্ধ্যায় ১৭ আগস্ট করতোয়া নদীতে তাসফিয়ার মরদেহ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা এটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় ও পুলিশের ভাষ্য হলো, ঢাকায় থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। গত ৯ আগস্ট ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন সাফিউল। এরপর ১৪ আগস্ট শুক্রবার সে তাসফিয়াকে মাদরাসায় ভর্তি করানোর জন্য বিন্যাগাড়ি রোডের জোবাইদা মহিলা মাদরাসায় রেখে আসে। পরে রোববার বিকেলে ভর্তি-সংক্রান্ত ছবি তোলার নাম করে তাসফিয়াকে সেখান থেকে নিয়ে আসে সাফিউল। ওই দিন রাত ৯টা ১৬ মিনিটে তাসফিয়া নিজেই ফোন করে আগের মাদরাসায় জানায়, তাকে অন্য একটি মাদরাসায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এরপর মাদরাসার পথে না গিয়ে শিশুটিকে একের পর এক জায়গা বদলাতে থাকে সাফিউল।
তাসফিয়ার জীবন ছিল ভাঙা সংসারের গল্পে মোড়া। তার মা লিজার সঙ্গে আপন বাবা মমিনুলের বিচ্ছেদ ঘটে ২০২২ সালে। এরপর তাসফিয়া বাবার কাছে থাকত। পরে লিজা সাফিউল ইসলামকে বিয়ে করেন। ২০২৫ সালের দিকে পরিবারের অগোচরে তাসফিয়াকে দ্বিতীয় স্বামীর কাছে নিয়ে আসেন তিনি।
আরও পড়ুন: চলতি বছরে ৯ মাসে ‘মব’ সহিংসতায় নিহত ১৮৭ জন
তারপর শিশুটিকে সৎ দাদা-দাদির কাছে রেখে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যান লিজা ও সাফিউল। লিজা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন এবং সাফিউল রিকশা চালাতেন। অভাবের সংসারে ধীরে ধীরে দাম্পত্য কলহ বাড়তে থাকে, যার নির্মম শিকার হয়ে যায় ছোট্ট তাসফিয়া।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শিশু তাসফিয়া হত্যার ঘটনায় তার সৎ বাবা সাফিউল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় শিশুটির নিজের বাবা বাদী হয়ে এজাহার দায়ের করেছেন। বৃহস্পতিবার গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন