০৭:১৪ পি.এম
জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬ পাস হলো। নতুন এই আইনে জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং (বাজি বা পণ), বাজিকর, ম্যাচ ফিক্সিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ মোট ২৪ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রেখেছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাস্থ্যমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উপস্থাপন করলে তা সর্বসম্মতি নিয়ে পাস হয়। অধিবেশনটির সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।
এর আগে ২৩ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬ উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়, যাতে cinco কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়। কমিটির সুপারিশের পর আজ বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
আরও পড়ুন: তারেক রহমান: জামায়াত-এনসিপি আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান সহ্য করতে পারছে না
নতুন পাস হওয়া এই বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান ‘The Public Gambling Act, 1867’ দেড় শতাধিক বছরেরও বেশি পুরোনো। ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া প্রতিরোধে বিদ্যমান আইনি কাঠামো অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল।
অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে সংঘটিত জুয়া, অর্থপাচার ও প্রতারণা বাংলাদেশের সামাজিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং তরুণ সমাজের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এ কারণে পুরোনো আইনটি রহিত করে কঠোর সাজার বিধান রেখে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন আইনে সাধারণ জুয়ার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। জুয়ার স্থান পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও চার লাখ টাকা অর্থদণ্ডের পাশাপাশি আদালতের আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভবন, কক্ষ, যানবাহন, সার্ভার অবকাঠামো বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। জুয়ার সামগ্রী সংরক্ষণ, প্রস্তুত, সরবরাহ, বিক্রি, বিতরণ, আমদানি বা ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং আদালতের মাধ্যমে এসব সামগ্রী বাজেয়াপ্ত বা ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। বাজিকর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা, প্রতিযোগিতা বা ক্রীড়া কার্যক্রমে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। একইভাবে জুয়ার বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, মিথ্যা লাভের প্রতিশ্রুতি, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটিকে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম
ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, হোস্টিং, ডোমেইন সার্ভিস, ক্লাউড অবকাঠামো বা কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতির মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন, গোপন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর অধীন সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate Offence) হিসেবে গণ্য হবে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি, করপোরেট সংস্থা, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, হোস্টিং প্রোভাইডার, পেমেন্ট গেটওয়ে বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, অংশীদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে, যদি না তিনি প্রমাণ করেন যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতসারে সংঘটিত হয়েছে এবং তা প্রতিরোধে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিকেও পৃথকভাবে অভিযুক্ত করা যাবে এবং আদালত প্রয়োজনে তাদের নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল বা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একই অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ পর্যন্ত দণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, ডিভাইসসহ অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে প্রদান করা হয়েছে। অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হবে, অন্য অপরাধের বিচার হবে এখতিয়ারসম্পন্ন ফৌজদারি আদালতে। আইনের অধীন সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। তদন্তের ক্ষেত্রে সাব-ইন্সপেক্টরের নিচের পদমর্যাদার কোনো পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন না এবং প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট বা ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে ফ্রিজ করা যাবে।
এছাড়া সরকারের দ্বারা বা সরকার-নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জনস্বার্থে জুয়া বা বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, ইউআরএল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ, চ্যানেল এবং ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা থাকবে। জুয়ার অর্থে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস, পেমেন্ট গেটওয়ে, ডিজিটাল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টো ওয়ালেট বন্ধের নির্দেশও আদালত দিতে পারবেন। পাশাপাশি জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, অর্থপাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে একটি জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ প্রণয়ন, এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং সিস্টেম বাস্তবায়ন, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন