০৭:৩০ পি.এম
হাফিজুর ইসলাম মহানগরী খুলনার একটি বেসরকারি এতিমখানার শিক্ষার্থী। তার বয়স ১২ বছর এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে।
এরপর থেকে তার আশ্রয় হয়েছে এমিতখানায়। এতিমখানায় জীবন নিয়ে তার একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘বাসার কথা মনে হলে কষ্ট লাগে। অনেক সময় ইচ্ছে না হলেও কষ্ট করে এতিমখানার খাবার খেতে হয়। এখানে খেলাধুলার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই।’
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মিনহাজ উদ্দিন মিলিটারির দাফন সম্পন্ন
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার সরকারি ও বেসরকারি এতিমখানায় শিশুদের জন্য সুষম খাবারের অভাব রয়েছে। এভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, এতিমখানার প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু প্রধানত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণ করছে। এই পুষ্টির চরম অসামঞ্জস্য কারণে এতিমখানার শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এদিকে, সুষম খাবার থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরাও বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের শর্করাগ্রহণের হার ২৪ শতাংশ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিন ও খুলনা সিটি করপোরেশন উইমেন্স কলেজের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিহা মাহাজাবিন।
গবেষকরা বলছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খাবার তালিকায় শর্করা ছাড়া প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা জরুরি। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্যও ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় কৃষকের দুটি সেচপাম্প পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, এতিমখানার ৮৯.৬ শতাংশ শিশুই মূলত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার, বিশেষ করে ভাত গ্রহণ করে। অপরদিকে, আমিষ পাওয়ার হার ৮ শতাংশ মাত্র। এর তুলনায় মধ্যবিত্ত পরিবারের ৬০ শতাংশ শিশু যথেষ্ট প্রোটিন গ্রহণ করছে, কিন্তু শর্করা গ্রহণ করছে ২৪ শতাংশ।
ফলে এতিমখানার শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এতিমখানার ২২.৪ শতাংশ শিশু তীব্র পুষ্টিহীনতায় এবং ৫৩.৬ শতাংশ শিশু মাঝারি ধরনের পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। তাদের হাঁড়ের গঠন বা বুদ্ধি বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন বা আমিষ জোটে মাত্র ৮ শতাংশের ভাগ্যে। মোটের ওপর, ৭৬ শতাংশ এতিমখানার শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার।
এছাড়া, মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৩.৬ শতাংশ শিশু তীব্র ও ৩২ শতাংশ শিশু মাঝারি পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পাশাপাশি, এসব পরিবারের ৫২.৮ শতাংশ শিশু স্বাভাবিক পুষ্টির অধিকারী হলেও ১.৬ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় আক্রান্ত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় শিশুদের জন্য চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো সরকারি শিশু পরিবার বালক, সরকারি শিশু পরিবার বালিকা, সরকারি ছোটমনি নিবাস এবং সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে মোট ৫০০টি। এসব শিশুদের জন্য প্রতি মাসে বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা, যার মধ্যে এক হাজার টাকা শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়। বাকি টাকা তিনবেলা খাবারের জন্য খরচ করা হয়।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকার জাল নোটসহ ৪ জন গ্রেপ্তার
এছাড়া, সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ৭০টির বেশি বেসরকারি এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং রয়েছে।
গবেষণার জন্য ১২৫ জন এতিম এবং ১২৫ জন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্কুলগামী ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের সাক্ষাৎকার ও শারীরিক পরিমাপ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এতিমখানায় আসা শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি (৫০.৪ শতাংশ) মাত্র তিন থেকে ছয় বছর বয়সে সেখানে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে ৩১ শতাংশের বেশি এক কক্ষে ৭ থেকে ১০ জন, ২৪ শতাংশের বেশি এক কক্ষে ১৫ জন গাদগাদি করে বসবাস করে।
এতিমখানার ৪০ শতাংশ শিশুই অসুস্থতার সময় ভালো চিকিৎসা সুবিধা পায় না এবং ৭৯ শতাংশ শিশু অসুস্থ অবস্থায় কোনো বিশেষ খাবার বা বাড়তি যত্ন পায় না। এর পাশাপাশি, তারা খেলাধুলা বা বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।
গবেষণায় মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরিবারের শিশুরা ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে বেকারি পণ্য ও অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুডের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এই শিশুরা।
আরও পড়ুন: ফজুমিয়ারহাট বাজারে আল ইনসাফ ফাউন্ডেশনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান
গবেষকদলের প্রধান তোহরা সাফা বলেছেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শুধু শর্করা নয়, খাবারের তালিকায় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করা আবশ্যক। একইসঙ্গে, তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে এতিমখানাগুলোতে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা এবং স্নেহপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদেরও ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করা উচিত।
খুলনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীন শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশুর খাবারের জন্য চার হাজার টাকাসহ মাসে মোট বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা। এই অর্থের মাধ্যমে সাধ্য অনুযায়ী তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর প্রচেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে আমরা বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছি। বরাদ্দ বাড়ালে শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন