০৭:৩২ পি.এম
ইসরায়েলি বন্দিদশা কিভাবে একটি মানুষের জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে, এর জলজ্যান্ত উদাহরণ বহন করছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুজাহিদ বানি মুফলেহ। গত ২৮ জুন ২০২৫ তারিখে নাবলুসের বেইতা শহরের নিজ বাড়ি থেকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়া তাকেও আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। দীর্ঘ ছয় মাস প্রশাসনিক আটকাদেশে থাকার সময়, গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মুক্তি পাওয়ার পর মুজাহিদ যে অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসেন, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৫ কেজি ওজন হারিয়ে বসা চোখ আর ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে ফিরে আসা মুজাহিদকে দেখে চেনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ৩৬ বছর বয়সী এই তিন সন্তানের জনক, কারাবন্দী অবস্থায় তৈরি হওয়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অনাহার এবং চরম চিকিৎসা অবহেলার শিকার হয়েছিলেন।
মুক্তির মাত্র দুদিন পর মস্তিষ্কে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ও স্ট্রোকের ফলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা তার মাথার খুলির একটি অংশ কেটে ফেলে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জন্য জরুরি অস্ত্রোপচার করেন, যার পর দীর্ঘ দুই মাস তিনি কোমায় ছিলেন। বর্তমানে জেনিনের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুজাহিদের প্রতিটি বাক্য এখন ধীর আর দীর্ঘ যন্ত্রণাময় বিরতিতে ভরা। তিনি নিজেই বলেছিলেন, নির্যাতনের মধ্যে তার শরীর ও কথা বলার ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু তার স্মৃতি এখনো বন্দিশালার সেই অন্ধকার দিকগুলোতে আটকে রয়েছে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সব সময় স্বপ্ন দেখেছিলেন, কারাগারের ভেতরের নির্মমতার গল্পগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন, কিন্তু স্ট্রোকের কারণে আজ তিনি নিজেই একটি করুণ গল্পের অংশ হয়ে গেছেন।
হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে মুজাহিদ স্মরণ করেন তার সেলমেটদের কথা, যারা নির্যাতনের ফলে কারাগারে জীবন হারিয়েছেন। তিনি জানান, পঞ্চাশোর্ধ্ব সমীর আল-রিফাইয়ের কথা, যাকে আদালত থেকে ফেরার পর ব্যাপক নির্যাতন করা হয় এবং পরে সেলে পেপার স্প্রে ছিটানোর পর তার মৃত্যু হয়। তিনি চোখের সামনে দেখেছেন ২০ বছর বয়সী তরুণ আহমদ তাজাজাহকে, যার মুখে নির্যাতনের সময় হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সামান্য অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে তার ক্ষত ইনফেকশন হয়ে এবং অনবরত বমি করে ছেলেটি এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বন্দিদশার এই ভয়াবহ দিনগুলিতে মুজাহিদ কেবল তার ছোট ছেলে আরবের কান্নার মুখটি মনে করে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজতেন, যে দৃশ্যটি তাকে গ্রেফতারের সময় নিজের চোখের সামনে ঘটেছিল।
আরও পড়ুন: অভিজিতের পর আটক হলেন নেহা বোরা, দিল্লি পুলিশের হাতে
মুজাহিদের স্ত্রী নুহা আল-শুরফা জানান, মুজাহিদের ফিরে আসা তাদের পরিবারের জন্য এক নতুন জীবন পাওয়ার মতো হলেও তার পুরোপুরি সুস্থ হওয়া এখনো অনেক দূরের পথ। ফুসফুসের জটিলতার আশঙ্কায় গত পাঁচ মাস ধরে তিনি ঠিকমতো পানি পর্যন্ত পান করতে পারছেন না। কারাগারের দিনগুলিতে মুজাহিদকে জীবনের এক চরম বাস্তবতা শিখিয়েছে, যেখানে এক টুকরো রুটি বা এক ঢোক ঠাণ্ডা পানি পাওয়ার স্বপ্নই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে ফেরার লড়াইয়ে থাকা মুজাহিদ মনে করেন, বিছানা থেকে ওঠা বা ব্যথামুক্ত একটি রাত কাটানোর মতো সাধারণ বিষয়গুলোই মূলত জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তিনি এখনও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, শারীরিক অক্ষমতাকে পরাজয় দেন এবং কারাগারের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর তিনি দুনিয়ার সামনে তুলে ধরবেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন