০৫:২৫ পি.এম
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাকে ‘সম্ভাবনাময়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, টেকসই বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ধারা যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে সক্ষম হবে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
আরও পড়ুন: রমজানের আগে নিত্যপণ্যের আমদানি ও এলসি বৃদ্ধি, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে আশা
ড. এনামুল হক বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী বছরগুলোতে কমপক্ষে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্যমতে, ‘বাংলাদেশ যদি ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৬ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, তাহলে ২০৩০-এর দশকের শুরুতেই অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।’
এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে একটি উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের কথাও তুলে ধরেন।
দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের দেওয়া পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় ড. এনামুল বলেন, মূল্যস্ফীতিসহ বাংলাদেশের নামমাত্র প্রবৃদ্ধি বছরে প্রায় ১২ শতাংশ থাকতে পারে। যদি এ ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
তিনি বলেন, ‘সরকার একা এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। এতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও প্রকৃত বিনিয়োগ অপরিহার্য।’
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে মারা গেলেন ডিবি পুলিশের কনস্টেবল পারভেজ রানা
ড. এনামুল আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। দেশের প্রতিটি জেলার উন্নয়নের সমান অধিকার রয়েছে।’
তার মতে, রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে এবং সারাদেশে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নগর পরিকল্পনার উন্নয়ন ও রাজধানীর বাইরের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে ড. এনামুল বলেন, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ ও জনগণের রায় অবহেলা করলে ফ্যাসিবাদের পরিণতি হবে: ইসহাক খন্দকার
তিনি সতর্ক করেন যে, মানুষ যদি ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তারা আর্থিক ব্যবস্থায় টাকা জমা রাখবে না।
তিনি আরও জানান, জোরপূর্বক একীভূতকরণের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে যাবে না।
ড. এনামুলের ভাষায়, ‘দুটি দুর্বল ব্যাংক মিলিয়ে একটি সুস্থ ব্যাংক তৈরি করা সম্ভব নয়।’
তিনি এ পরিবর্তনের জন্য কঠোর জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করতে ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নতি করতে ব্যর্থ হলে দুর্বল ব্যবস্থাপনার ব্যাংকগুলোকে তাদের পরিণতি ভোগ করতে দেওয়ার পরামর্শ দেন।
আরও পড়ুন: জামায়াতের দাবি, আইজিপির বক্তব্য সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী
আর্থিক খাতের সুশাসনের বিষয়ে ড. এনামুল বলেন, আইনের শাসন শক্তিশালী না হলে জনগণের আস্থা ফিরবে না। তিনি জানান, মানুষকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাদের আমানত নিরাপদ আছে এবং অন্যায়কারীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
পুঁজিবাজার সম্পর্কে ড. এনামুল বলেন, অর্থবহ পুনরুদ্ধারের জন্য আর্থিক খাত ও সুশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আইনের শাসন বজায় থাকলে ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হলেই পুঁজিবাজার সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
সর্বশেষ, সরকারি ব্যয়ে দুর্নীতি কমানো এবং সঠিক প্রকল্প বাছাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন বিআইডিএস মহাপরিচালক।
আরও পড়ুন: ক্রসফায়ারের চিন্তা পুলিশের ব্যর্থতা ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার প্রকাশ: আমীনের উদ্বেগ
তিনি বলেন, আমাদের মূল সমস্যা প্রকল্প নয়, সমস্যা হলো প্রকল্প বাস্তবায়নে অপচয় ও দুর্নীতি।
তিনি উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়নে আরও শক্তিশালী পেশাগত বিশ্লেষণের আহ্বান জানান। বিশেষ করে তিনি সামাজিক সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার মূল সমস্যা নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক প্রকল্প নির্বাচন ও সময়মতো সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
সাক্ষাৎকারের শেষে, ড. এনামুল হক বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রধানত টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন