০১:২০ পি.এম
ইউরোপের প্রধান দেশগুলোতে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের বোঝা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সাধারণ জনগণকে উগ্র ডান ও বামপন্থি দলগুলোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেওয়ার ঘটনা এই সংকটের একটি বড় উদাহরণ। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও বেতনভোগী শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, উদার গণতন্ত্র উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোকে এখন অনেকেই একই ধরনের রাজনীতির ধারক হিসেবে দেখছেন। এসব দলের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন—এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি, ঋণের ব্যয় ও সুদের হার বৃদ্ধির কারণে সরকারগুলোর পক্ষে জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় বড় পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: মিসরের পার্লামেন্ট সৌদিকে সামরিক সহায়তা দিতে অনুমোদন করেছে
ফলস্বরূপ, ফ্রান্সে মেরিন লো পেনের উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি ও জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর উগ্র বামপন্থি ফ্রান্স আনবোড—দুই ধারার দলই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ও বামপন্থি ডি লিংকের সমর্থন বাড়ছে।
আগামী এক বছরে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়াতে পারে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জ মেলোনিকেও কট্টরপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমছে
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, গণতন্ত্রের কার্যক্রম নিয়ে ইউরোপের বড় দেশগুলোতে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্রান্সে ৬৯ শতাংশ, স্পেনে ৬৮ শতাংশ, ইতালিতে ৬২ শতাংশ এবং পোল্যান্ডে ৪৭ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রেও এই হার ৬৯ শতাংশ।
আরও পড়ুন: মোদির বিরুদ্ধে খাড়গের আপত্তিকর মন্তব্যে বিজেপির তীব্র বিক্ষোভ ভারতজুড়ে
অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ও যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির অধ্যাপক ড্যারন অ্যাসেমোগলুর মতে, গণতন্ত্রের সংকটের পেছনে দুটি বড় ব্যর্থতা রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে সমৃদ্ধি সুষমভাবে বণ্টনে ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য বৃদ্ধি।
বিশ্বায়ন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার ও আয়বৈষম্যের কারণে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা কমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিও চাকরি ও জীবিকা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক ও অন্যান্য মৌলিক সেবার মান বজায় রাখতে সরকারগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অ্যাসেমোগলুর মতে, উদার গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।
জার্মানিতে মধ্যপন্থিদের সংকট
আরও পড়ুন: আইইএ প্রধান: ২০২৭ সালেও জ্বালানির বাজার স্বাভাবিক হবে না
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানিতেও মধ্যপন্থি রাজনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী মধ্য-ডানপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) এবং মধ্য-বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি) বর্তমানে জনসমর্থন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
অভিবাসন, চীনের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের মধ্যপন্থি নীতি ও ব্যাপক অভিবাসন গ্রহণের সিদ্ধান্তে সিডিইউর রক্ষণশীল সমর্থকদের একটি অংশ দূরে সরে যায়। সেই জায়গা দখল করেছে এএফডি।
বর্তমান জনমত জরিপের গড় হিসাবে জার্মানিতে এএফডির সমর্থন প্রায় ২৮ শতাংশ। সিডিইউ ও তাদের জোটসঙ্গী সিএসইউর সমর্থন ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ, গ্রিন পার্টির ১৫ শতাংশ এবং এসপিডির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। বামপন্থী ডি লিংকের সমর্থনও ১১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
এ পরিস্থিতিতে কার্যকর সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মূলধারার দলগুলোর মধ্যে উগ্র ডানপন্থিদের মোকাবিলায় কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়েও মতবিরোধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আরও পড়ুন: বিজেপি অফিসের সামনে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার হুমকি পশ্চিমবঙ্গের বিধায়কের
ইউরোপের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনগুলো ইউরোপের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিভক্ত পার্লামেন্ট ও জোট সরকারে ছোট উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে মূলধারার দলগুলো আরো কট্টর অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যক্রমও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আগামী বসন্তে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন লো পেন জয়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি, ইউরোর ভবিষ্যৎ, ন্যাটো ও ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মজুরি বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই এমন মানুষের জন্যও উন্নতির সুযোগ এবং প্রযুক্তির সুফল সবার মধ্যে বণ্টনের কার্যকর পরিকল্পনা।
আরও পড়ুন: এশিয়ায় ৭০ শতাংশই বাড়বে বিশ্বে জ্বালানি চাহিদা
আরএ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন