০৯:১৬ এম
আকাশপথে উড়ার সময় একটি বিমান এয়ার ইন্ডিয়ার, ৪ সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি চালকবিহীন ও ফ্লাইট কন্ট্রোলমুক্ত হয়ে গিয়েছিল। থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে নয়াদিল্লিগামী এআই-২৩৭৯ নম্বর ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিমানটি এক ধাক্কায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়।
বিশ্বখ্যাত বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারবাস’-এর প্রাথমিক ব্ল্যাক বক্স (ডিজিটাল ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার) বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এয়ারবাসের প্রাথমিক মূল্যায়নে পাওয়া গেছে যে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিমানটির তিনটি প্রধান হাইড্রোলিক সিস্টেম হঠাৎ করে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। ফলে বিমানের গতিপথ ও দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এলিভেটর, এইলারন এবং স্পয়লার সবই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং নিজেদের মতো চলতে শুরু করে। এটি এই ধরনের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং নজিরবিহীন এক ঘটনা।
আরও পড়ুন: ইরান: মার্কিন যুদ্ধজাহাজ সাগরে পেলেই ডুবিয়ে দেওয়া হবে
ফ্লাইট চলাকালীন উক্ত চার সেকেন্ডের মধ্যে বিমানের এলিভেটর এবং এইলারনগুলো পাইলটের নির্দেশনা ছাড়াই নড়াচড়া করতে থাকে। সাধারণত বিমানের সামনের অংশকে ওপরে বা নিচে নামাতে এলিভেটর, ডানার ভারসাম্য বজায় রাখতে এইলারন এবং বিমানের গতি কমাতে বা নামতে সহায়তা করতে স্পয়লার ব্যবহৃত হয়, যা সবসময় হাইড্রোলিক পাওয়ার অনুকূলে থাকে। এই সময় বিমানের অটো-পাইলট সিস্টেম স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ককপিটে স্টল ওয়ার্নিং (ডানা যথেষ্ট লিফট হারালে যে সতর্কতা সংকেত বাজে) সংকেত বেজে ওঠে। বিপদের আগেই বিমান পরিচালনায় নিযুক্ত কো-পাইলট সম্ভাব্য ক্র্যাশ এড়াতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুসরণ করে কন্ট্রোল স্টিক সামনের দিকে চেপে ধরেন। কিন্তু হাইড্রোলিক পাওয়ার সচল না থাকার কারণে বিমানটি তৎক্ষণাৎ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাইনি। চার সেকেন্ড পর যখন হাইড্রোলিক ব্যবস্থা সচল হয়, তখন বিমানটি হঠাৎ করে খাড়া নিচে নেমে যেতে শুরু করে। শারীরিকভাবে তীব্র ঝাঁকুনিতে চালক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও ততক্ষণে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং সিটবেল্ট না বাঁধা অনেক যাত্রী ও কেবিন ক্রু বিমানটির ছাদে আঘাত পান, যার ফলে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হন।
এনডিটিভি জানিয়েছে যে, ৭.৮ বছর পুরনো এ-৩২০ নিও মডেলের এই বিমানটির যাবতীয় তথ্য ফ্রান্সে অবস্থিত এয়ারবাসের ২৪ ঘণ্টার কারিগরি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ‘এয়ারট্যাক’-এ পাঠানো হয়। বোয়িং বা এয়ারবাসের উড়োজাহাজ থেকে ‘এসিএআরএস’ ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য পাঠানো ছাড়াও অবতরণের পরপরই এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে ব্ল্যাক বক্সের পূর্ণাঙ্গ ডাটা সংগ্রহ করে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। উক্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে গত ৫ আগস্ট মধ্যরাতে, অর্থাৎ ঘটনার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর এয়ার ইন্ডিয়ার কাছে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় এয়ারবাস। তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জরুরি পরিস্থিতির পেছনে একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রেশার সেন্সরকে দায়ী করা হলেও, সেটিই মূল কারণ কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এয়ারবাস এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত দিকনির্দেশনাও প্রদান করেনি।
বর্তমানে এই ঘটনার তদন্ত অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এয়ারবাস এবং ফরাসি দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা বিইএ-এর একটি যৌথ প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পৌঁছে বৃহস্পতিবার বিমানটি পরিদর্শন করছে। তাদের প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষার নতুন তথ্যগুলো ভারতের জাতীয় সংস্থা ‘এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’-র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন উপস্থিত করেছে।
অন্যদিকে, এই বিপজ্জনক ফ্লাইট বিপর্যয়ে বিমানটির মূল পাইলট ইন কমান্ড, ক্যাপ্টেন সুদীপ বশিষ্ঠের আচরণগত কোনো ভূমিকা ছিল কি না তা নিয়ে আলাদা তদন্ত চলছে। যদিও দুর্ঘটনার সঙ্গে উড়োজাহাজের কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক এখনও নিশ্চিত নয়, তবে ঘটনার পর বিমানবন্দরে করা দুটি প্রস্রাব পরীক্ষায় সুদীপ বশিষ্ঠের শরীরে মারিজুয়ানা (গাঁজা)-র উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ফ্লাইটের একজন কেবিন ক্রু অভিযোগ করেছেন যে, পাইলট ফ্লাইট শুরুর আগে গাঁজা সেবন করেছিলেন। এই গুরুতর অপরাধ ও নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসার পর এয়ার ইন্ডিয়া এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের সকল পাইলটদের জন্য শরীরে কোনো নিষিদ্ধ মাদক বা উপাদানের উপস্থিতি আছে কি না, তা নিশ্চিতে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: কানাডায় অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগে পাঁচ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন