০৯:২৬ পি.এম
শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ ঢাকা গড়তে বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে, এমনটাই জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
আজ ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, "সবার সহযোগিতায় ঈদের ছুটিকালীন সময়ে রাজধানীতে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা, নাশকতা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেনি।"
ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন আজ এই তথ্য জানিয়েছেন। পুলিশ কমিশনার বলেন, "পশুর হাট, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, শপিংমল, আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ঈদ জামাতস্থল, আবাসিক এলাকা এবং ফাঁকা বাসাবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির সকল ইউনিট নিরলসভাবে কাজ করেছে।"
আরও পড়ুন: নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
তিনি আরও বলেন, "ডিএমপির বিশেষ অভিযানে ১ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত ডিএমপির অপারেশনাল ইউনিটসমূহ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ৬৫৮ জন চাঁদাবাজ, ৯৭১ জন ছিনতাইকারী, ডাকাত ও সন্ত্রাসী এবং ১ হাজার ২১৫ জন মাদক কারবারিসহ সর্বমোট ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেফতার করেছে।"
এছাড়া একমাসে ৭৪৪ কেজি গাঁজা, ১ লাখ ৭৯ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, ৪০৫ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ২৮১ বোতল ফেন্সিডিল, ২৮ লিটার দেশি-বিদেশি মদ, ২৯ গ্রাম আইস, ৭৮ পিস ট্যাপেন্টাডল ও ২০ পিস নেশাজাতীয় ট্যাবলেট, ৬টি দেশি-বিদেশি পিস্তল, ২১ রাউন্ড গুলি, ৪টি ম্যাগাজিন, ১১টি ককটেল এবং ১২টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।
অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা ও অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন চক্রের ৬ জন চীনা নাগরিকসহ মোট ৯ জন গ্রেফতার হয়েছে। এছাড়া ৫২৩টি মোবাইল ফোন, ২৯৩টি সিমকার্ড, ৪টি মাইক্রোবাস, ৬টি প্রাইভেটকার, একটি কাভার্ডভ্যান, একটি বাস, ৯টি সিএনজি এবং ১৫টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, "ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ মে ২০২৬ মাসে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে সড়ক পরিবহন আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ৩৮ হাজার ২৮৪টি মামলা করেছে। এর মধ্যে ৬৭২টি মামলা হয়েছে এবং ৮ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০১ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।" ডিএমপির বিজ্ঞ স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটগণ আদালতের মাধ্যমে মে মাসে সড়ক পরিবহন আইন সংক্রান্তে ৩৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি করেছেন। এর মধ্যে ১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে মোট ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মে মাসে বিজ্ঞ স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটগণ কর্তৃক ফৌজদারি ৫ হাজার ২০৯টি ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫ হাজার ৯৫৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৪০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ধর্মীয় উৎসব শিশুদের নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দেয়: ডেপুটি স্পিকার
তিনি আরো বলেন, "ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তায় ডিএমপির বিশেষ অভিযানে ঈদের ছুটিতে অর্থাৎ ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত প্রায় জনশূন্য রাজধানীর নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃক বর্ধিত টহল, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট, অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি এবং সিসিটিভি প্রযুক্তিগত মনিটরিং অব্যাহত রাখা হয়েছে। ফলে ঈদের ছুটির ৭ দিনে আড়াই থেকে তিন কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে কোন ডাকাতি কিংবা চাঞ্চল্যকর কোন অপরাধ সংঘটিত হয়নি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি চুরি, ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।"
এটি তুলনামূলক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিচয় বহন করে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, "রাজধানীর পল্লবী থানাধীন একটি বাসায় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা আক্তার (৭) কে ধর্ষণের পর ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামিসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া রাজধানীর মুগদা থানা এলাকায় সৌদি প্রবাসী মোকাররমকে নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহ আট টুকরো করার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনাসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ২ জন আসামি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন।
তিনি আরও জানান, "রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনজন আসামিকে গ্রেফতার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। একজন আসামি বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন। পরে গত ১৪ মে রসুলনগর ক্যানেলপাড় পাকা সড়কে ৬/৭ জন সংঘবদ্ধ ডাকাত ভিকটিম মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে থাকা টাকা লুণ্ঠন করে চিটাগাং রোডের মদনপুর এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় ডেমরা থানা পুলিশ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং চারজন আসামিকে গ্রেফতার করে।
ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত একটি হায়েস মাইক্রোবাস ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। কমিশনার আরও বলেন, "রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানা ও গাজীপুর মহানগর এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করে ৩৪ লাখ জাল টাকা ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামাদিসহ চোরাকারবারি দলের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-উত্তরা বিভাগ। গত ২৬ মে যাত্রাবাড়ীতে মতিঝিল ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে কর্মচারীদের বেতনের ২৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে দস্যুতার ঘটনায় মামলা হলে থানা পুলিশ ২ লাখ টাকা উদ্ধারসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। একজন বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। গত ৩১ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় রুজুকৃত মামলায় নারায়ণগঞ্জ হতে দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছিনতাই হওয়া ২ টি ব্যাগ, কিছু প্রয়োজনীয় কাপড় এবং ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত ১ টি চাপাতি, ১টি ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: তালা ভেঙে বাসায় ঢুকে ৮ লাখ টাকা, ২ ভরি সোনা ও মূল্যবান সামগ্রী চুরি: ডেমরায় চাঞ্চল্য
কমিশনার বলেন, "দক্ষিণখান থানা এলাকায় গার্মেন্টসের কাপড় চুরির ঘটনায় ৩০ লাখ টাকার গার্মেন্টেসের কাপড় ও চোরাইকৃত কাভার্ডভ্যান উদ্ধারসহ ৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ১২ মে ২০২৬ রাজধানীর বংশাল থানাধীন নয়াবাজার বাগডাসা লেনে মো. নেছার আলী নামে এক شخصকে কে বা কারা তার বাসায় হত্যা করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে ১৭ মে ক্লু লেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৪ মে রাতে লালবাগ থানাধীন শহীদনগর ৩ নম্বর গলিতে মো. রাফি হোসেন (২৫) নামে এক ব্যক্তিকে কতিপয় দুর্বৃত্ত গুলি করে পালিয়ে যায়। উক্ত ঘটনায় ২০ মে রাফি মৃত্যু বরণ করে। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মূল শ্যুটারকে ২০ মে কক্সবাজার জেলা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার দেখানো মতে কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে নয় রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া এজাহারনামীয় আরও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি বলেন, "১৫ মে লালবাগ এলাকা থেকে হাসিব নামক আড়াই বছরের এক শিশু নিখোঁজ হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় লালবাগ থানা পুলিশ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ২০ মে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়। ১৫ মে চকবাজার থানাধীন দেবীদাসঘাট লেন এলাকার আলমবাগে মো. ইউনুস (৫০) নামে কিছু লোক পিটিয়ে হত্যা করে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ একজন এবং পরবর্তীতে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত ২৭ মে তারিখ কাফরুল থানা এলাকায় একটি ক্লু-লেস সিধেঁল চুরি মামলার ঘটনায় জড়িত তিনজন আসামি গ্রেফতার এবং চার ভরি গলিত স্বর্ণের পাত উদ্ধার করেছেন। গত ২ জুন আদাবরে অপহরণ ও ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় অপহরণকারীর নয় সদস্য গ্রেফতার করেছেন।
উল্লিখিত উদ্ধার ও অগ্রগতি ব্যতীত আরও অনেক সফলতা রয়েছে ডিএমপির। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান চলমান থাকবে। শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ঢাকা বিনির্মাণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বদা বদ্ধপরিকর মর্মে জানান ডিএমপি কমিশনার।
এসময় ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হকসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: ঢামেকে ভুয়া চিকিৎসক মো. রাকিব আটক, থানায় হস্তান্তর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন