১১:০৭ এম
আউল-বাউল ও লালনের দেশে ব্যান্ড সংগীতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম শিল্পী হলেন আইয়ুব বাচ্চু। অসাধারণ গায়কী ও গিটার বাজানোর দক্ষতা এবং নিজস্ব সংগীতভাষার মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছেন। তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেক সংগীতশিল্পীর পথচলায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে সংগীতজীবনে অসংখ্য অর্জনের পরেও কিছু স্বপ্ন তাঁর অপূর্ণ রয়ে গেছে।
আজ ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম প্রয়াণবার্ষিকী। ২০১৮ সালের এই দিনে বাংলা রক সংগীতের কিংবদন্তি ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁর স্মরণে বিভিন্ন আয়োজন করা হবে। পারিবারিকভাবে তাঁকে স্মরণ করা হবে এবং আয়োজন করা হবে দোয়া মাহফিল। ব্যান্ড সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও নানা আয়োজনে এই শিল্পীকে স্মরণ করবেন।
আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন গায়ক বা গিটারবাদক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি নতুনদেরও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। তাঁর অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনায় সংগীতজগতে অনেক শিল্পী জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের কাছে আইয়ুব বাচ্চু কেবল একজন তারকা নন, সংগীতের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও।
আরও পড়ুন: নেপালের নাট্যোৎসবে মঞ্চস্থ হবে বাংলাদেশের ‘এ ফাদার’স স্কাই’
১৫ লাখ দর্শকের সামনে কনসার্টের স্বপ্ন ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকের উচ্ছ্বাস। গানের পাশাপাশি গিটারের সুরে শ্রোতাদের মুগ্ধ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। কনসার্ট নিয়ে এই শিল্পীর একটি বড় স্বপ্ন ছিল, যা বাস্তবায়িত হয়নি।
এক সাক্ষাৎকারে আইয়ুব বাচ্চু তাঁর স্বপ্নের কনসার্টের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল এক কনসার্ট আয়োজনের ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেখানে দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে পারফর্ম করার পরিকল্পনা ছিল।
বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে মার্কিন গিটারবাদক স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি ও কার্লোস সান্টানা ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজও থাকবেন। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে আইয়ুব বাচ্চুর পরিকল্পনায় ছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদ।
স্বপ্নের সেই আয়োজনের ব্যাপ্তি বোঝাতে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, "আমরা একটা স্লট বাজাবো, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।"
আরও পড়ুন: সাত বছরেই ১২ ভাষায় দক্ষ গজনি অভিনেত্রীর মেয়ে, ঘরে নেই টিভি-মোবাইল!
তার কল্পনায় এটি ছিল কেবল একটি কনসার্ট নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তাকে বড় পরিসরে তুলে ধরার আয়োজন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
গিটার ঘিরে আরেক স্বপ্ন
গিটারের প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর ভালোবাসা ছিল আজীবনের। তিনি বিভিন্ন ধরনের দামি ও নামী গিটার সংগ্রহ করতেন। গিটার বাজানোর নিজস্ব দক্ষতা দিয়ে বাংলা রক সংগীতে তিনি তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচয়।
তবে তিনি নিজের গিটারচর্চা ও সংগ্রহের মধ্যেই এই ভালোবাসাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর ইচ্ছা ছিল, এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার, যেখানে ছেলেমেয়েরা গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে পারবে। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত শিল্পীরা এককভাবে কিংবা দল গঠন করে সংগীতজগতে নিজেদের প্রতিভার পরিচয় দেবেন।
আরও পড়ুন: জাফর পানাহির ৫ বছরের কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ
নতুন সংগীতশিল্পী তৈরির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যান্ড সংগীতের বিকাশে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেই উদ্যোগও পূর্ণতা পায়নি আইয়ুব বাচ্চুর জীবদ্দশায়।
যেভাবে হয়ে উঠলেন আইয়ুব বাচ্চু
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। পরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৭৩ সালে বাবার কাছ থেকে গিটার পাওয়ার পর শুরু হয় সেই বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাঁর নিবিড় পথচলা।
কলেজজীবনে বন্ধুদের নিয়ে ‘গোল্ডেন বয়েজ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন তিনি। স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করত দলটি। ১৯৭৭ সালে যোগ দেন ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে। সেখানে জেমসের সঙ্গে একই দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয় তাঁর।
আরও পড়ুন: কৃতি শ্যানন: ইনস্টাগ্রামে এআই দ্বারা তৈরি ছবি সরানোর সুযোগ নেই
১৯৮০ সালে আইয়ুব বাচ্চু যোগ দেন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। দীর্ঘ সময় এই দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। একই বছরের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনসার্টের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে দলটি।
১৯৯২ সালে এলআরবি প্রকাশ করে ‘এলআরবি ১’ ও ‘এলআরবি ২’ নামে দুটি অ্যালবাম। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এই দ্বৈত অ্যালবাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরে ‘সুখ’ অ্যালবামের মাধ্যমে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় এলআরবি।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অচেনা জীবন’, ‘মনে আছে নাকি নাই’, ‘স্পর্শ’ ও ‘যুদ্ধ’-এর মতো অ্যালবাম। এসব গানের মধ্য দিয়ে বাংলা ব্যান্ড সংগীতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে এলআরবি।
ব্যান্ডের বাইরেও ছিল জনপ্রিয়তা
আরও পড়ুন: যৌবন ধরে রাখতে রেড লাইট থেরাপি নিচ্ছেন সানিয়া মির্জা
এলআরবির সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি একক শিল্পী হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘রক্ত গোলাপ’, ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কি!’, ‘পথের গান’ ও ‘জীবন’। সব মিলিয়ে ১৬টি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রের গানেও ছিল তাঁর উপস্থিতি; অন্তত এক ডজন সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন এই শিল্পী।
আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ, গিটার আর গান বাংলা সংগীতের শ্রোতাদের কাছে এখনো সমানভাবে স্মরণীয়। তাঁর প্রয়াণের পরও সেই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও তাঁর গান শুনছেন, গিটারের সুরে খুঁজে নিচ্ছেন নিজেদের আবেগের প্রকাশ।
সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। জন্মশহর চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে তাঁর সম্মানে স্থাপন করা হয়েছে গিটার ভাস্কর্য।
জীবদ্দশায় আইয়ুব বাচ্চু নিজের স্বপ্নের কনসার্ট কিংবা সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান- কোনোটিই বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তবে তাঁর গান, গিটারের সুর এবং নতুন শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করার উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। মৃত্যুর সাত বছর পরও শ্রোতাদের ভালোবাসায় বেঁচে আছেন ‘রূপালি গিটার’-এর এই জাদুকর।
আরও পড়ুন: শাহরুখের ৬১তম জন্মদিনে ‘মান্নাত’-এ দেখা মিলবে না
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন