১১:৪৫ এম
বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর পর কিছু ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ঋণ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা তেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর ফলে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের অভাব থাকায় ব্যাংকগুলো প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অর্থ বিনিয়োগ করছে। তারা সহজ পন্থা হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, কলমানি এবং অন্যান্য ব্যাংকে আমানত হিসেবে অর্থ রাখছে। কিন্তু তাতেও বড় অঙ্কের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়ে যাচ্ছে। যা ব্যাংকগুলোকে সমস্যায় ফেলছে। ফলে এসব ব্যাংক নতুন আমানত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত করছে এবং সুদহার ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
অতিমাত্রায় তারল্য থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক সবচেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে রয়েছে। এই ব্যাংকের উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ৮৮ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে পূবালী ব্যাংক, যার উদ্বৃত্ত তারল্য ৩২ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে ব্র্যাক ব্যাংক রয়েছে, যার অতিরিক্ত তারল্য ২৯ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। চতুর্থ স্থানে অগ্রণী ব্যাংক, যার উদ্বৃত্ত তারল্য ২৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আর শীর্ষ পাঁচে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, যার অতিরিক্ত তারল্য ২৮ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা।
এছাড়া সিটি ব্যাংকের ২৩ হাজার ৯৮৪ কোটি, ব্যাংক এশিয়ার ২৩ হাজার ৫১৮ কোটি, যমুনা ব্যাংকের ২২ হাজার ৪৬৯ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংকের ১৭ হাজার ৫৪৪ কোটি এবং প্রাইম ব্যাংকের ১৬ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে।
আরও পড়ুন: ব্র্যাক ব্যাংক দেশে প্রথম ওমনিচ্যানেল ব্যাংকিং সেবা চালু করলো
গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এই ১০ ব্যাংকের কাছে ৩ লাখ ১২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ছিল।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হয়েছিল। সরকার পতনের পর সেই সীমা তুলে দিয়ে সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়। ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করলেও ভালো ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদে আমানত পাচ্ছে। কারণ, আমানতকারীরা বেশি সুদের চেয়ে টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে ভালো ব্যাংকগুলোয় আমানত বাড়লেও তারা সেই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছে না। মূলত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর ফলে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন মন্তব্য করেন, ‘উদ্বৃত্ত তারল্যের সবটাই ট্রেজারি বিল বা বন্ড, অন্য ব্যাংকের চালু করা বন্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রি-ফাইন্যান্স প্যাকেজ এবং অন্য ভালো ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে প্লেসমেন্টের মতো খাতে লাভজনকভাবে ও নিরাপদে বিনিয়োগ করা আছে। যেহেতু এসব বিনিয়োগ লাভজনক, তাই আমানতকারীদের সুদ পরিশোধে কোনো বাড়তি চাপ নেই। থাকার প্রশ্নও আসে না। আর এগুলো সব ভালো ব্যাংক। প্রত্যেকটির ব্যালান্সশিট বেশ ভালোভাবে ভারসাম্যপূর্ণ।’
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ঋণ হিসেবে বিতরণ না হলেও অলস পড়ে নেই। এসব অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণের কারণে বর্তমানে খেলাপি ঋণের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী বছর থেকে ব্যাংকগুলো নতুন করে বিনিয়োগে ফিরবে।
আরও পড়ুন: শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানালেন মন্ত্রী, গঠন হলো মজুরি বোর্ড
তবে তারল্য নিয়ে সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক নয়। অনেক ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য রাখতে পারছে না। তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য ঘাটতি ৪ হাজার ২২৭ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এক হাজার ৮৮ কোটি, ইউনিয়ন ৭৬৭ কোটি, পদ্মা ৬০০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৬২৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ৫২৫ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ৩১৯ কোটি, গ্লোবাল ৩৮৭ কোটি এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৩৮ কোটি টাকার তারল্য ঘাটতিতে রয়েছে।
আমানতের সুদহার কমাচ্ছে ব্যাংকগুলো
অতিরিক্ত তারল্যের চাপে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাংকগুলো গত দুই মাসে দুই দফায় আমানতের সুদহার কমিয়েছে। একাধিক ব্যাংক তাদের মেয়াদি আমানতের সুদহার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়েছে। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার যেখানে ৯ থেকে ১০.১৫ শতাংশ ছিল, আগস্টে তা কমে সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসে। সম্প্রতি তা আরো কমে সাড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে পূবালী ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতে সুদহার ছিল ৮.৪৪ শতাংশ। আগস্টে তা কমে যথাক্রমে ৮.২১ শতাংশ ও ৮.৪১ শতাংশ হয়।
আরও পড়ুন: স্বর্ণের দাম ১ নভেম্বর ২০২৬: ২২ ক্যারেট ২ লাখ ১৭ হাজার ৫৯২ টাকা
ব্র্যাক ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ছিল ৮.৩৫ শতাংশ এবং এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতে ছিল ৯.২৬ শতাংশ। পরে তা কমে যথাক্রমে ৮.১৭ শতাংশ ও ৯.১৮ শতাংশ হয়। ব্যাংক এশিয়ার এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ছিল ৯.৪২ শতাংশ, আগস্টে তা কমে ৮.৯৮ শতাংশ হয়। যমুনা ব্যাংকের এক বছর মেয়াদি আমানতের সুদহার জুলাইয়ে ৯.৬৩ শতাংশ থেকে কমে আগস্টে ৯.৫৯ শতাংশ হয়। এর চেয়ে বেশি মেয়াদের আমানতের সুদহার ৯.২৬ শতাংশ থেকে কমে ৯.২০ শতাংশ হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, ‘আমানত সংগ্রহ এখন অনেক ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমানতের সুদ ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে ব্যাংকের তেমন লাভ থাকছে না। কারণ, বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র পাওয়া যাচ্ছে না। আবার আমানতকারীরা টাকা রাখতে এলে তাদের ফিরিয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমাতে শুরু করেছে।’
ঋণ বিতরণে মন্দায় জমছে উদ্বৃত্ত তারল্য।
টানা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে স্থবিরতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ঋণ নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য ও ভালো গ্রাহক না পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমে থাকছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৭৫ শতাংশে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের ৮০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা মন্তব্য করেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে তারল্য নিয়ে এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকটে ভুগছে, অন্যদিকে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে রয়েছে। ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে উচ্চ সুদ পরিশোধ করলেও সেই অর্থ বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র পাচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে না। এতে একদিকে ব্যাংকের আমানত ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত তারল্য থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন