০৭:০০ পি.এম
ইরানের রাজনীতির চরম নাটকীয় মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান শান্তি আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ।
চিরপরিচিত রক্ষণশীল ভাবমূর্তি এবং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক এই কমান্ডার এখন নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি।
ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় সম্পর্ককে কূটনৈতিক টেবিলে এনে সমাধানের চেষ্টা করছেন তিনি, যা তাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তার নিজ রক্ষণশীল শিবিরের কট্টরপন্থীদের।
আরও পড়ুন: স্বর্ণ চুরি করে গাড়ি কিনে গ্রেপ্তার যুবক সমর চ্যবন
খবরে বলা হয়েছে, গালিবাফ বস্তুত একজন রক্ষণশীল বাস্তববাদী। তিনি পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক মেরামতের পাশাপাশি চীনের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার নীতিতে বিশ্বাসী।
তার বৈদেশিক নীতির সুর অনেকটাই সাবেক মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির মতো হলেও রুহানির মতো তিনি নিজের রক্ষণশীল সমর্থক গোষ্ঠীকে পুরোপুরি চটাতে চান না।
দেশের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সাথে গালিবাফের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কই মূলত তাকে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার সাহস জোগাচ্ছে।
ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে প্রথম দফার আলোচনার পর কট্টরপন্থীরা মোজতবা খামেনির কাছে গালিবাফের বিরুদ্ধে লালরেখা অতিক্রমের অভিযোগ তুলেছিলেন।
আরও পড়ুন: ইসরাইলের নির্বাচনের সম্ভাব্য ৮ ফলাফল প্রকাশিত
কিন্তু নতুন সর্বোচ্চ নেতা তাদের সেই দাবি নাকচ করে দিয়ে গালিবাফের প্রতি পূর্ণ আস্থা বজায় রাখেন এবং পরবর্তীতে তাকে চীনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবেও নিয়োগ দেন।
আইআরজিসি-র একজন তরুণ যোদ্ধা থেকে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন গালিবাফ।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে ভাই হারানোর স্মৃতি এবং সম্মুখ সমরের অভিজ্ঞতা তাকে দ্রুত সামরিক পদোন্নতির শীর্ষে নিয়ে যায়।
নব্বইয়ের দশকে তিনি আইআরজিসি বিমান বাহিনীর প্রধান হন। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে ছাত্র বিক্ষোভ দমনের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামিকে সতর্ক করে যে ২৪ জন সিনিয়র আইআরজিসি কমান্ডার চিঠি দিয়েছিলেন, গালিবাফ ও প্রয়াত কাসেম সোলেইমানি ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।
আরও পড়ুন: সাগর হত্যা মামলায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি পরিবারের
পরবর্তীতে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি জাতীয় পুলিশের প্রধান হন এবং পরবর্তীতে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন।
রাজনীতির ময়দানে তিনি নিজেকে বারবার নতুন রূপ দিয়েছেন; কখনও একাডেমিক ও অভিজ্ঞ পাইলট হিসেবে, আবার কখনও কর্মঠ বিপ্লবী শাসক হিসেবে।
২০০৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারের পর তিনি টানা ১২ বছর তেহরানের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা নগরটির ইতিহাসে দীর্ঘতম।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় প্রেমিকের ডাকে গিয়ে তরুণী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার
তেহরান ও মাশহাদের রাজপথে তাদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে।
অন্যদিকে, কট্টরপন্থী পায়দারি ফ্রন্ট এবং 'কায়হান' পত্রিকার মতো কঠোর অবস্থানকারী মাধ্যমগুলো অভিযোগ তুলেছে যে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা দেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা বিসর্জন দিয়েছেন।
তবে রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে সংস্কারবাদীদের অবস্থান। একসময় গালিবাফের কঠোর সমালোচক থাকা সংস্কারবাদী গোষ্ঠী ও সংবাদমাধ্যমগুলো এখন প্রকাশ্যে তাকে সমর্থন জানাচ্ছে।
তাদের মতে, দেশের টিকে থাকা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি করা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন: মেহেরপুরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় মোশারফকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড
ফলে যে সেনানায়ক একসময় সংস্কারবাদীদের আন্দোলন দমনে মূল ভূমিকায় ছিলেন, আজ দেশের স্বার্থে কূটনীতির পথ বেছে নিয়ে সেই সংস্কারবাদীদেরই সমর্থন পাচ্ছেন, যা ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও জটিল অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন