০৯:০৮ পি.এম
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যখন একজন দেশের সরকারপ্রধান জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক ফোরামে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন সফরের প্রতিটি কর্মসূচি, বৈঠক, আলোচনা, অর্জন ও প্রত্যাশা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। এই সফর শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সফর নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাত মাসের মধ্যে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় সুযোগ। এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জলবায়ু, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরকে কেন্দ্র করে আলোচনা ও সমালোচনা—দুটিই হতে পারত। গণমাধ্যমের দায়িত্ব ছিল সফরের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং প্রয়োজন হলে গঠনমূলক প্রশ্ন করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মনে হয়েছে, আমাদের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে অন্য কিছু বিষয় নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল।
আরও পড়ুন: পাইলট তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক প্রতিফলন: বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি
বিশেষ করে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে আগে থেকেই নির্ধারিত রাজনৈতিক বিতর্ক, দলীয় রাজনীতি কিংবা পরস্পরকে দোষারোপের বিষয়গুলোই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। একজন সাংবাদিকের কাজ কেবল স্টুডিওতে বসে রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা করা নয়। সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা, অনুসন্ধান এবং জনগণের সামনে সঠিক তথ্য তুলে ধরা সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সফরটি সফল হয়েছে কি না—তা বিচার করার অধিকার যেমন জনগণের রয়েছে, তেমনি প্রধানমন্ত্রীরও রয়েছে জনগণের কাছে তার সফরের অর্জন তুলে ধরার দায়বদ্ধতা।
কয়টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে? কী কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে? বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন কোন বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া গেছে? নতুন কোনো বিনিয়োগ, সহযোগিতা বা সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না? আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে? সফরের সীমাবদ্ধতা বা অপূর্ণতাই বা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব গণমাধ্যমের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের অনেক গণমাধ্যমেই এসব মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান বা বিশ্লেষণ চোখে পড়েনি।
আরও পড়ুন: ব্যাটারিচালিত ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা গেজেট প্রকাশ করল সরকার
এখানে প্রশ্নটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফলতা বা ব্যর্থতার নয়। আসল প্রশ্ন হলো—এই সফর থেকে বাংলাদেশের জনগণ কী পেল?
সরকারের অর্জনকে সরকারপন্থী প্রচারণায় পরিণত করা যেমন সাংবাদিকতার কাজ নয়, তেমনি কোনো অর্জনকে অস্বীকার করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়। একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা, প্রশ্ন করা এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা।
আমাদের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশের মধ্যে এখন যেন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি পক্ষপাত অনেক সময় সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলছে। সংবাদপত্র বা টেলিভিশনে কোন খবর কতটা গুরুত্ব পাবে, কোন বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান হবে এবং কোন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত যদি কেবল মালিকপক্ষ, প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার চিন্তা থেকে নেওয়া হয়, তাহলে সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অথচ একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম সরকারের প্রতিপক্ষ নয়; বরং রাষ্ট্রের স্বার্থে সরকারের একটি গঠনমূলক সহযোগী। গণমাধ্যম সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবে, ভুল হলে প্রশ্ন করবে, অনিয়ম হলে অনুসন্ধান করবে এবং প্রয়োজন হলে কঠোর সমালোচনাও করবে। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিনিষ্ঠ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক।
আরও পড়ুন: বনবিভাগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুবলার চরে ১২০০ মাছ ধরার ট্রলার
বিশেষ করে একটি নতুন সরকারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্টদের গঠনমূলক ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারের বয়স যখন মাত্র কয়েক মাস, তখন ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে সময়মতো সতর্ক করা অনেক বেশি কার্যকর। কারণ সরকারকে যদি শুরুতেই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের অনেক বড় ভুল এড়ানো সম্ভব।
অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের এ কথাই শেখায়—ক্ষমতাসীন সরকার যখন দীর্ঘ সময় ধরে শুধু প্রশংসা শুনতে থাকে এবং সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন একসময় বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের ধারণা ও জনগণের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব শেষ পর্যন্ত সরকার ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
তাহলে এখনই সরকারের উচিত গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা না করে বরং গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত অভিজ্ঞ সাংবাদিক, গবেষক, লেখক, কলামিস্ট ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করা।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন একটি দায়িত্বশীল, স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম পরিবেশ তৈরি করা। এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিকরা ভয় বা প্রভাবমুক্তভাবে প্রশ্ন করতে পারবেন, গবেষকরা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কথা বলতে পারবেন এবং সরকারের ভালো-মন্দ উভয় দিকই জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারবেন।
আরও পড়ুন: তানভীর হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের
সরকারের দায়িত্ব দেশ পরিচালনা করা, আর গণমাধ্যমের দায়িত্ব জনগণকে তথ্য দেওয়া এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। এই দুইয়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পেশাদার দূরত্ব বজায় থাকলেই রাষ্ট্র উপকৃত হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর সফর তাই শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে চলবে না। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য কী অর্জন হলো, কী সম্ভাবনা তৈরি হলো এবং কোথায় ঘাটতি রয়ে গেল—তা নিয়ে তথ্যভিত্তিক জাতীয় আলোচনা প্রয়োজন।
সরকারের প্রশংসা করার জন্য যেমন গণমাধ্যমের প্রয়োজন নেই, তেমনি সমালোচনা করার জন্যও সমালোচনা করা সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রয়োজন সত্যকে সামনে আনা। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি, দল বা সরকারের একার নয়—প্রশ্নটি বাংলাদেশের। প্রশ্নটি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের।
আজ যদি সরকার ও গণমাধ্যম উভয় পক্ষই নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে। আর সে লক্ষ্যেই এখন প্রয়োজন—চাটুকারিতা নয়, সত্য কথা বলার সাহস; অন্ধ সমর্থন নয়, গঠনমূলক সমালোচনা; আর ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, সর্বাগ্রে বাংলাদেশ ও জনগণের স্বার্থ।
আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জে জমিসংক্রান্ত বিরোধে বাবা-মেয়েকে চোখ উপড়ে হত্যা
লেখক : সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, যুবদল ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ); সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন