০৭:২১ এম
সংযুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ক্যানসার গবেষকদের বার্ষিক সম্মেলন মঙ্গলবার (২ জুন) শেষ হয়েছে। সম্মেলনে গবেষকরা ক্যানসার চিকিৎসার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ওজন কমানোর ওষুধের সম্ভাব্য উপকারিতা সম্পর্কিত প্রাথমিক হলেও আশাব্যঞ্জক তথ্যও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (এএসসিও)’র বার্ষিক সভায় উপস্থাপিত সর্বশেষ অগ্রগতিগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ ওয়াশিংটন থেকে পাঠানো এএফপির প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।
অগ্ন্যাশয় ক্যানসার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি
আরও পড়ুন: বৃষ্টি বলয়ের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’
উপস্থাপিত সাত হাজারেরও বেশি গবেষণার মধ্যে অগ্ন্যাশয় ক্যানসার বিষয়ক একটি গবেষণা বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর মধ্যে একটি অগ্ন্যাশয় ক্যানসার নিয়ে পরিচালিত এ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালকে কয়েক দশকের মধ্যে রোগটির বিরুদ্ধে প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন স্টার্টআপ রেভল্যুশন মেডিসিনস উদ্ভাবিত এ চিকিৎসায় ‘ডারাক্সোনরাসিব’ নামে একটি নতুন অণু ব্যবহার করা হয়েছে।
এটি রোগটির একটি আক্রমণাত্মক কিন্তু সাধারণ ধরনে আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আয়োজনের পরিকল্পনা করছে ইসি: সিইসি
গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের অর্ধেকের বেশি ১৩ মাসেরও বেশি সময় বেঁচে ছিলেন, যা কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের তুলনায় দ্বিগুণ।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ মন্টি পাল বলেন, ‘উন্নত পর্যায়ের অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের চিকিৎসায় এটি এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন।’
গবেষণাটি অন্যান্য নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সম্ভাবনাও উন্মোচন করেছে, কারণ এই অণুটি এমন একটি প্রোটিনকে লক্ষ্য করে, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে জড়িত।
সম্প্রতি পর্যন্ত ওই প্রোটিনের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো চিকিৎসা পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: বিএনপির ডাক, সরকার পতনের একদফা আন্দোলন: ২৮ অক্টোবর
ওজেম্পিক কি ক্যানসারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে?
গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ের হলেও আশাব্যঞ্জক তথ্য উপস্থাপন করেছেন যে, ওজন কমানোর জনপ্রিয় ওষুধ ওজেম্পিক এবং উইগোভি ক্যানসারের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিপাকতন্ত্রের একটি হরমোন (জিএলপি-১) অনুকরণকারী এ ওষুধগুলো মূলত ডায়াবেটিস চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তবে হৃদ্রোগসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও এগুলো উপকারিতা দেখিয়েছে।
স্থূলতা ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক মার্কিন নাগরিক এই ওষুধ ব্যবহার করেন এবং এসব রোগের কারণে তাদের নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।
আরও পড়ুন: জবি শিক্ষার্থী জোবায়েদ হত্যা মামলার অভিযোগ গঠন শুনানি পেছাল ৮ নভেম্বর
এ প্রেক্ষাপটে গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেন, ওষুধগুলো ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায় থেকে মেটাস্ট্যাটিক বা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া পর্যায়ে অগ্রগতি ঠেকাতে পারে কিনা।
ফলাফলে দেখা যায়, প্রচলিত ডায়াবেটিস চিকিৎসা গ্রহণকারীদের তুলনায় জিএলপি-১ অ্যাগোনিস্ট গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে ফুসফুস, স্তন, কোলোরেক্টাল ও লিভার—এ চার ধরনের ক্যানসারে রোগের অগ্রগতি ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
গবেষণার প্রধান লেখক মার্ক অরল্যান্ড বলেন, তথ্যগুলো আশাব্যঞ্জক হলেও এলোমেলোভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে এগুলোর আরও নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল শুরু।’
আরও লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে আহ্বান ল্যানসেটের
সম্মেলনে উপস্থাপিত কয়েকটি গবেষণায় ক্যানসার চিকিৎসার অপ্রয়োজনীয় অংশ কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে একটি গবেষণায় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বগলের লসিকাগ্রন্থি অপসারণের অস্ত্রোপচার (অ্যাক্সিলারি লিম্ফ নোড ডিসেকশন) পুনর্মূল্যায়ন করা হয়।
নতুন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, ক্যানসার যদি মাত্র এক বা দুটি লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ওই অস্ত্রোপচার না করলেও রোগীদের জন্য তা নিরাপদ হতে পারে।
এ ধরনের অস্ত্রোপচারের উল্লেখযোগ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।
আরও পড়ুন: মাওয়া প্রান্তে পদ্মায় গোসলে নেমে নিখোঁজ রাসেলের মরদেহ উদ্ধার
এএসসিওর সহ-সভাপতি জুলি গ্রালো বলেন, ‘আমরা সম্ভবত প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি লসিকাগ্রন্থি অপসারণ করছি, যা রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণ হচ্ছে।’
প্রোস্টেট ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদ্ধতি
গবেষকরা প্রোস্টেট ক্যানসার নিয়ে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ট্রায়ালের ফলাফলকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রোস্টেট ক্যানসার পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এটি ক্যানসারজনিত মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ।
নতুন গবেষণাটি জিনগত মিউটেশন বহনকারী রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারে, কারণ তাদের ক্ষেত্রে রোগটি সাধারণত বেশি আক্রমণাত্মক হয়।
গবেষকরা দুটি চিকিৎসা একসঙ্গে প্রয়োগ করেছেন- টিউমার বৃদ্ধিতে সহায়ক হরমোন সংকেত বন্ধ করতে ‘এনজালুটামাইড’ এবং ক্যানসার কোষের ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে ‘টালাজোপারিব’।
যেসব রোগীর মধ্যে ইজঈঅ২ জিনের মিউটেশন ছিল, তাদের ক্ষেত্রে টালাজোপারিব যুক্ত করায় টিউমারের অগ্রগতি বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৬৫ শতাংশ কমেছে।
গবেষণার সমন্বয়কারী ফরাসি-মরক্কোর অধ্যাপক করিম ফিজাজি ফলাফলকে ‘অসাধারণ’ এবং ‘একটি বড় অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রক্ত পরীক্ষা: এখনও চূড়ান্ত সমাধান নয়
কিছু গবেষণায় ‘লিকুইড বায়োপসি’ বা রক্তভিত্তিক পরীক্ষার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, বিশেষ করে চিকিৎসার প্রতি প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত শনাক্ত করার ক্ষেত্রে।
এছাড়া যেসব ক্যানসারের জন্য প্রচলিত স্ক্রিনিং পদ্ধতি নেই, সেগুলো আগেভাগে শনাক্ত করতেও রক্ত পরীক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল।
একটি গবেষণায় ‘গ্যালারি’ নামের একটি রক্ত পরীক্ষার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়, যা উপসর্গ প্রকাশের আগেই ৫০ ধরনের ক্যানসার শনাক্ত করার দাবি করে।
তবে গবেষণার ফলাফল সর্বসম্মত সমর্থন পায়নি।
যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও ১২ ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেরিতে রোগ নির্ণয়ের হার কমানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন