০২:০১ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন শান্তি উদ্যোগের ঘোষণা দিলেও গাজায় থামেনি ইসরায়েলের সামরিক অভিযান। স্থানীয় সময় রোববার (০২ আগস্ট) ভোর থেকে অবরুদ্ধ উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর একাধিক বিমান ও ড্রোন হামলায় নির্বিচারে অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছে নারী ও শিশুও।
পশ্চিম গাজা সিটির আল-সৌসি টাওয়ারের একটি আবাসিক ভবনে চালানো বিমান হামলায় নিহত হন ৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আযযাম। এ তথ্যটি নিশ্চিত করেছে আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র।
হামলার ফলে অনেকেই আহতও হয়েছেন। খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-কারারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। তারা হলেন ৩৮ বছর বয়সী মাহমুদ আল-হামস, তার ৩৭ বছরের স্ত্রী ফাতিমা এবং তাদের কন্যাসন্তান। এ ঘটনাটিও নিশ্চিত করেছেন নাসের হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
আরও পড়ুন: কিশোর গ্যাংয়ের হামলার শিকার সাংবাদিক রুহেল, ঢামেক আইসিইউতে
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার কাছে নিজ বাড়িতে হামলার ফলে নিহত হয় ৬৮ বছর বয়সী কামু আবু মুয়াইলিক এবং তার ৫৯ বছরের স্ত্রী হুদা। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় মারা যান দুই ভাই। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় আরো একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
বিভিন্ন স্থানে হামলার ফলে আহতের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকার বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। গাজা সিটির পশ্চিম এলাকায় রেমাল নামক এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন। এছাড়া গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে হামলায় আরো চারজনের প্রাণহানি ঘটে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ভোর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ওষুধের গুদামে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ জানান, চিকিৎসা সামগ্রী ধ্বংস করে ‘ওষুধ এবং রোগকেই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছেন, হামলায় দুটি স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আরো দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর জন্মদিনে জেরুজালেমে বিক্ষোভ, গাড়িবহরে বোতল নিক্ষেপ
গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান গাজার বিভিন্ন এলাকায় নিচু দিয়ে উড়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এ হামলাগুলোর আগে বাসিন্দাদের কোনো সতর্কতা বা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
বেশিরভাগ হামলার লক্ষ্য ছিল আবাসিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট এবং সাধারণ মানুষের সমাবেশস্থল। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থানে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। গত শনিবারও গাজার বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন। শুক্রবারও পৃথক হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা বোর্ড অব পিস এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স শুক্রবার জানিয়েছে, হামাস যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের একটি বিস্তারিত রূপরেখা গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এ বিষয়ে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা এবং মানবিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধের কারণে যুদ্ধবিরতি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন: কাতালোনিয়ায় ইসলামফোবিয়ার উত্থানে রাজনীতির সমীকরণ বদলে যাচ্ছে
তাদের মতে, এটি লেবানন ও গাজায় আগের যুদ্ধবিরতিগুলোর মতোই—যেগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, অন্তত ১ হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল। বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান জানিয়েছেন, হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না। তাদের দাবি, হামাস ভবিষ্যতে আবারও সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।
এছাড়াও ইসরায়েল চায়, প্রয়োজনে গাজার ওপর সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা থাকুক। কাতার ও তুরস্কের তদারকির ভূমিকা এবং হামাসের জব্দ করা অস্ত্র ধ্বংস করা হবে নাকি নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত থাকবে-এসব বিষয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে।
আরও পড়ুন: পশ্চিম তীরে বন্দুকযুদ্ধে দুই ফিলিস্তিনি নিহত, আহত ছয় ইসরায়েলি সেনা
অন্যদিকে, ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, আলোচনার সময় হামলা বন্ধ রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তার দাবি, হামাস নিরস্ত্রীকরণে আন্তরিক নয়। প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত বলে তিনি মতামত দিয়েছেন।
হামাস অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতেই ইসরায়েল হামলা বাড়িয়েছে। সংগঠনটির দাবি, রোববার সকালে হামলায় ১৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং বহু পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তারা মধ্যস্থতাকারী ও যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা দেশগুলোর কাছে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিস-এর প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীরা ‘দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ১ নভেম্বর থেকে ফোনে কলারের নাম-পরিচয় দেখা যাবে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন