০৭:৩৮ পি.এম
একটি মাত্র ভুল সিদ্ধান্ত চার বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং লালিত স্বপ্নকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। ফুটবল বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞে শুধু খেলোয়াড়রা নন, মাঠের অপর নায়কদেরও মোকাবিলা করতে হয় এক চরম মানসিক ও শারীরিক অগ্নিপরীক্ষার। সম্প্রতি ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেফারি প্যানেল চূড়ান্ত করার পর এই আলো-আঁধারির গল্প আবারও সামনে এসেছে। এবারের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে টেক্সাসের অভিজ্ঞ রেফারি ইসমাইল এলফাত, যখন তিনি নিজের ঘরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইতালির মার্কো গুইদার মতো অনেক নামী রেফারিকে বাদ পড়ার বেদনায় পুড়তে হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানোর জন্য যেকোনো রেফারির ক্যারিয়ারের মূল শিখরে পা রাখার সুযোগ ঘটে। কিন্তু, এই পথটি মোটেও মসৃণ নয়। ফিফার নিবিড় পর্যবেক্ষণ, কঠোর ফিটনেস পরীক্ষা এবং অবিশ্বাস্য মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তবেই মিলবে চূড়ান্ত টিকিট। রেফারিদের গতি, শক্তি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত ট্র্যাক করা হয় জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে। এমনকি তাদের ঘুমের তথ্যও ফিফা কর্মকর্তাদের নজরদারিতে চলে যায়। কনমেবল ও কনকাকাফ অঞ্চলের রেফারিদের নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক সেমিনারে দেখা গেছে, চরম চাপের মুখে তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া কিভাবে ঘটে, তা নিরূপণ করতে স্পোর্টস সায়েন্টিস্টদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
মাঠে নামার পরে এই চাপ আরও বাড়ে। রেফারিরা কেবল একটি ম্যাচ পরিচালনা করেন না, বরং অনেক সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হয় দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে অথবা আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচের তীব্র উত্তেজনা সামলানো রেফারিদের কাছে আজও সেই মুহূর্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকে। যখন হাজার হাজার দর্শক এবং কোটি কোটি টেলিভিশন স্ক্রিনের চোখ একটি মাত্র বাঁশির ওপর আটকে থাকে, তখন সাধারণ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে। কাতার বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেওয়া পেনাল্টি অথবা ভিনসেন্ট আবুবাকারকে লাল কার্ড দেখানোর মতো ঘটনাগুলো রেফারিদের রাতারাতি বিশ্বের আলোচনায় নিয়ে আসে এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের ট্রোলের শিকারও হতে হয়।
আরও পড়ুন: আটঘরিয়ায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস খেলোয়াড় বাছাই পর্বের উদ্বোধন
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষে বাস্তবতার নিষ্ঠুরতা শুরু হয়। টুর্নামেন্টের মধ্যে যেন তৈরি হয় আরেকটি প্রতিযোগিতা। যেখানে প্রতিটি ম্যাচের পর রেফারিদের নিজেদের মধ্যে একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলে পরবর্তী পর্বের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। ফিফা অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের পরও বিতর্ক এড়াতে রেফারিদের দেশে ফিরিয়ে পাঠিয়ে দেয়, যা জার্মানির ড্যানিয়েল সিবার্ট এবং স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচের ক্যারিয়ারে একটি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফাইনালে বাঁশি বাজানোর স্বপ্ন প্রতিটি রেফারির মনে থাকে। কিন্তু সেখানেও কাজ করে আন্তর্জাতিক গঠনমূলক সমীকরণ। যেমন ঘটেছিল ইংলিশ রেফারি অ্যান্থনি টেইলরের ক্ষেত্রে; রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণে ভালো পারফর্ম করা সত্ত্বেও তাকে ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে, সমস্ত বাধা কাটিয়ে যারা ফাইনালের সোনালী ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাতে পারেন, তাদের জন্য এটি জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা হয়। যেমনটি ২০১০ সালের ফাইনাল পরিচালনা করা সহকারী রেফারি ড্যারেন ক্যান পরম আনন্দে স্মরণ করেন। সেই সোনালী মুহূর্ত এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরের স্বস্তি কাটিয়ে আবারও শুরু হয়ে যায় পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার একটি অন্তহীন লড়াই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন