০১:৫৭ এম
দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে বন্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্যোগ, যা অন্যান্য অনেকের মধ্যে অন্যতম। ভারি বর্ষণের জন্য বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে এবং হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা দুর্গতরা সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং থাকার নূনতম পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বন্যার সময় কিছু রোগ-বালাই দেখা দেয়। এই দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি এসব রোগ-বালাই থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং সচেতন হতে হবে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-জাপান চুক্তি: ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হবে পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসংস্থান চুক্তি
* বিশুদ্ধ পানি
বন্যার সময় পানির উৎস হিসেবে পানিকে ভালোমতো ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা প্রয়োজন, এছাড়া এটি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে হবে। যদি বন্যার পানিতে টিউবওয়েল তলিয়ে যায় তবে এক কলস পানিতে তিন-চার চা চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে টিউবওয়েলের ভেতর ঢালা উচিত। আধা ঘণ্টা রেখে দিয়ে একটানা আধা ঘণ্টা চেপে বের করে ফেললে সে পানি খাওয়ার উপযোগী হয়ে যাবে। যদি ব্লিচিং পাউডার না থাকে তবে এক ঘণ্টা টিউবওয়েলের পানি চেপে বের করে ফেলতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য টিউবওয়েলের পানিও ভালোমতো ফুটিয়ে গ্রহণ করা উচিত এবং পানি একটানা ৩০ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করতে হবে। যদি পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকে, তবে প্রতি দেড় লিটার পানিতে ৭.৫ মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট (হ্যালো ট্যাব), তিন লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট, এবং ১০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রেখে দিলে পানি বিশুদ্ধ হয়। আবার বাসার পানির ট্যাংকের প্রতি এক হাজার লিটারে ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার এক ঘণ্টা রাখতে পানিকে বিশুদ্ধ করা সম্ভব। তবে এই ক্ষেত্রে ভাইরাস জীবাণু ধ্বংস হয় না।
* ডায়রিয়া প্রতিরোধে
বন্যার সময় ডায়রিয়া হচ্ছে প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা। তাই খাওয়ার আগে এবং পায়খানা করার পরে হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করার ওপর জোর দিতে হবে। যদি ডায়রিয়া শুরু হয় তাহলে পরিমাণ মতো খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের পাতলা পায়খানার পর ১০-১২ চা চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুদের জন্য ২০ থেকে ৪০ চা চামচ খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে। খাওয়ার স্যালাইন না থাকলে বিকল্প হিসেবে লবণ-গুড়ের শরবত খাওয়াতে হবে। এ সময় নিরাপদ পানি খাওয়ানো যেতে পারে। শিশুর পুষ্টিহীনতা রোধে খিচুড়ি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলও গ্রহণ করা উচিত। যদি পাতলা পায়খানা ও বমির মাত্রা বেড়ে যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার শিকার প্রতিমন্ত্রী ইশরাক
* খাবার গ্রহণে সতর্কতা
বন্যার সময় অনেক মানুষ পচা বা বাসি খাবার খেতে বাধ্য হন, ফলে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে খিচুড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যকর। খাবারের প্লেট সাবান ও নিরাপদ পানিতে ধোয়া উচিত। অনেকেই পানি বেশি খরচ হয় বলে প্রথমে একবার সাধারন পানিতে থালা-বাসন ধুয়ে তারপর ফুটানো পানিতে ধুয়ে থাকেন, তবে এটি সঠিক নয় কারণ এতে থালা-বাসনে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।
* দুর্ঘটনা থেকে সাবধানতা
বন্যার সময় আকস্মিক বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে, যেমন বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া, সাপ এবং পোকা-মাকড়ের কামড়ের ঘটনা। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা পানিতে পড়ে থাকতে দেখলে তা স্পর্শ না করে দ্রুত বিদ্যুৎ কর্মীদের খবর দিতে হবে। সাপ এবং ইঁদুর মানুষ ও পশপাখির মাঝে অবস্থান নেয়, ফলে সাপ কাটার ঘটনা বেড়ে যায়। বিষহীন সাপে কাটলে ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু বিষধর সাপে কাটলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। হাসপাতালে জরুরিভিত্তিতে অ্যান্টিভেনম এবং টিটেনাস প্র্যাকটিশ প্রয়োগ করতে নির্দেশ পেরাতে হবে। ইঁদুরে কাটলেও অবহেলা না করে ডাক্তারদের পরামর্শ নিতে হবে।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে ইয়াবা কারবারিদের ধরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ, থানার ক্যাশিয়ার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
* মলত্যাগে সতর্কতা
বন্যার সময় যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করা দূষণ ছড়ায়, যা পেটের পীড়া এবং কৃমির সংক্রমণ বৃদ্ধি করে। সম্ভব হলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মলত্যাগ করতে হবে এবং পরে হাত সাবান বা ছাই দিয়ে ভালো করে ধোয়া উচিত। মলত্যাগের সময় খালি পায়ে থাকলে বক্রকৃমির জীবাণু শরীরে সংক্রমিত হয়। এ সময় বাসার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত। তবে দুই বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
* বন্যা-পরবর্তী সতর্কতা
বন্যা-পরবর্তী সময় মানুষ (দুই বছরের নিচের শিশু ছাড়া) ও গবাদিপশুকে কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। শামুক বিভিন্ন পরজীবীর বা কৃমির মধ্যবর্তী পোষক হিসাবেও কাজ করে। শামুক যখন হাঁসের খাবার হয়ে যায় তখন তা কম ক্ষতিকর। এ ছাড়াও কৃমিনাশক নিয়মিতভাবে চার থেকে ছয় মাস অন্তর খাওয়ানো উচিত।
আরও পড়ুন: ইশরাকের পদত্যাগের পর স্ত্রীর রহস্যময় পোস্ট
লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন