০৪:৩৮ পি.এম
মাত্র ৩২ সেকেন্ডের একটি ফ্লাইট পরিবর্তন করেছে ভারতের এভিয়েশন খাত। এশিয়াতে ভারতেরই নয়, গোটা বিশ্বের এভিয়েশন প্রেক্ষাপটে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-১৭১ ফ্লাইটের ৩২ সেকেন্ডের উড়ান।
এক বছর আগে ভারতের আহমেদাবাদের সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে উড়ান পূরণের ঠিক ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে পাশের বিজে মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। দুর্ঘটনার সময় বিমানে থাকা পাইলট, যাত্রী, ক্রুসহ মোট ২৪১ জনের মধ্যে একজন যাত্রী ছাড়া সবার মৃত্যু ঘটে, এবং যেখানকার ১৯ জনসহ মোট ২৬০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল সে দিন।
অনেক দূরের মানুষ হয়তো এই দুঃখজনক স্মৃ্তিকে ভুলে গেছেন, কিন্তু আজও ২৬০টি পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারানোর দগদগে ক্ষতের সাথেই দিন কাটাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন বহাল, রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ
সিতাবেন পাটানি নামের এক মহিলা ঠেলাগাড়িতে যুবক বয়সী একটি সময়োপযোগী চায়ের স্টল চালাতেন। সেই সময় সিতাবেনের ১৫ বছরের ছেলে আকাশ পাটানি তাঁর মায়ের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখন গাছের ওপর বিমানটি ভেঙে পড়ে, আর কিশোর আকাশ তখন আকাশের তারা হয়ে যায়।
অন্যদিকে সিতাবেন হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন তৃতীয় ডিগ্রী জখম নিয়ে, যদিও নিজে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে বারবার ছেলের খবর নিচ্ছিলেন। তবে তাঁকে তখন সত্যটি জানানো হয়নি।
আকাশের প্রিয় নাতির মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে ২০ দিন পর মারা যান তাঁর দাদা বাবুভাই পাটানি। সন্তানের হার, স্ত্রীর সাথে হাসপাতালের মৃত্যুর চরম সংগ্রাম এবং পিতার মৃত্যুর ভাবনা, সমস্ত কিছু মিলে অটোরিকশাচালক সুরেশভাই পাটানির জীবনে অধ্যায় ভেঙে পড়ে।
এর পরও সকল দুঃখকে বিমূর্ত করে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসা চালালে। অসুস্থ শরীরে সিতাবেন শোকের এসব ধাক্কা নিতে পারবেন না ভেবে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। বাবার মৃত্যুর পর সিতাবেন এক মাস পর তাঁর ছেলের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। সন্তানের মৃত্যুর শোক, শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা এখনো তাঁকে কষ্ট দেয়। প্রতিদিন ছেলের কথা ভেবে তিনি চোখের জল ফেলেন।
আরও পড়ুন: গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ভারত সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, আশাবাদী শামা ওবায়েদ
কাঁদতে কাঁদতে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের বললেন, ‘আমি শেষবারের মতো ছেলেটাকে দেখতেও পারিনি। আমার স্মৃতিগুলো ১২ জুনেই থমকে গেছে, যখন আকাশ বেঁচে ছিল। এরপর থেকে আমার স্মৃতি সামনে আর এগোয়নি এবং আমি বিশ্বাস করি আমি কখনো এসব নিয়ে এগোতে পারবো না।’
সিতাবেনের মতো ২৬০টি পরিবারে প্রতিদিনের কান্নার চিত্র। সরকারের ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট কিছুটা মিটলেও প্রিয়জন হারানো কখনই পয়সার বিনিময়ে মিটে না।
এআই-১৭১ দুর্ঘটনার পর ভারতের দ্রুত পরিবর্ধনশীল এভিয়েশন খাতের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। বিমান সংস্থা এবং কোম্পানির শেয়ার দামে পড়তে থাকে। তবে ২৬০ জন মানুষ জীবন দিয়ে ভারতের এভিয়েশন খাতের বড় উপকারের কাজও করে গেছেন। লোভের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এইসব এয়ারলাইনস মালিকরা নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে, সতর্কতা আরো কড়া হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সত্যিকার অর্থেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ‘সেফটি ফার্স্ট’ শুধুমাত্র কথার মধ্যেই না হয়ে কার্যকরী রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ৩২ সেকেন্ডের এই ফ্লাইটের দুর্ঘটনার তদন্ত এক বছরের মাথায়ও শেষ না হওয়ায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় কলম্বিয়ার বিদ্রোহী শিবিরে সেনা হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৯
এআই-১৭১ ফ্লাইটটি বিজে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের হোস্টেল ও ক্যান্টিনের ওপর আছড়ে পড়েছিল জানাব। তারপর থেকে ওই দুইটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে, যেন অভিশপ্ত রহস্যময় বাড়ি। কিন্তু দুর্ঘটনার এক বছর পর গুজরাটের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল পানসারিয়া সেই ছাত্রাবাস এবং ক্যান্টিনের পুনর্নির্মাণের বড় পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন।
নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি দুর্ঘটনার ক্ষতি কাটিয়ে সম্ভাবনার ফুল ফোটানোর ঘোষণা দিলেন, ৫৪৭ কোটি টাকা খরচ করে বিজে মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাস পুনর্নির্মাণ করা হবে।
তিনি বললেন, ‘বিজে মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসকে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার হাব হিসাবে গড়ে তোলা হবে, যা মেডিক্যাল পড়ুয়াদের জন্য নতুন আশা সৃষ্টি করবে।’ ভাঙা ও পোড়া ভবনগুলো সরিয়ে ফেলা হবে। ঠিক যেখানে বিমানটি আছড়ে পড়েছিল, সেখানে প্যারাপ্লেগিয়া স্পাইন হাসপাতাল তৈরি হবে। তার পাশাপাশি দুটি ক্যাম্পাস, রিহ্যাবিলিটেশন কেন্দ্র, ফিজিওথেরাপি কলেজ ও হোস্টেল তৈরি করা হবে। ১ লাখ ৭১ হাজার ১০০ স্কয়ার মিটার জমিতে শিক্ষকদের জন্য ছয়টি কোয়ার্টার তৈরি হবে, যেখানে ১২০টি ফ্ল্যাট থাকবে। এছাড়া স্নাতক স্তরের ছাত্রদের জন্য দুটি হোস্টেল ব্লক নির্মাণ করা হবে, যেখানে ৩৬৪টি রুম থাকবে। স্নাতকোত্তর স্তরের বিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য ১৬১টি ইউনিট বরাদ্দ থাকবে। এর সঙ্গে মেস ও ক্যান্টিনও থাকবে। নতুন ক্যাম্পাসে গুজরাটের ফার্মাসিউটিক্যাল টেস্টিংয়ের জন্য বিশ্বমানের ফুড অ্যান্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরি তৈরি করা হবে।
বিজে হাসপাতালে নির্মিত নতুন ক্যাম্পাস ও মেডিকেল হাব হয়তো স্মৃতি হয়ে থাকবে ২৬০ জনের জন্য। এই হাসপাতালে সেবাগ্রহীতারা ভালো সেবা পেলে যাতে দুর্ঘটনায় নিহত ২৬০ জনের আত্মা যেন শান্তি পায়।
আরও পড়ুন: রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার হলেন কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন