১০:৪৮ এম
দেশের হিমায়িত চিংড়ি খাতের সংকট দিন দিন গভীর রূপ ধারণ করছে। বিশ্ববাজারে কম দামে বেশি উৎপাদনশীল ‘ভেনামি’ চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে বাংলাদেশ এখনো মূলত ‘বাগদা’ চিংড়ির ওপর নির্ভরশীল।
ফলে, ১৪ বছরের ব্যবধানে দেশের চিংড়ি রপ্তানি প্রায় ৬২ শতাংশ কমে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), মৎস্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫০ হাজার টন চিংড়ি রপ্তানি করে আয় করেছিল প্রায় ৫৭ কোটি ডলার। তবে সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি নেমে এসেছে মাত্র ১৯ হাজার টনে, এ থেকে আয় হয়েছে ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলার।
এর মানে হচ্ছে, ১৪ বছরের ব্যবধানে চিংড়ি রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩১ হাজার টন, অর্থাৎ ৬২ শতাংশ। এই একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমেছে ২৮ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।
আরও পড়ুন: সাংসদকে বাঁচাতে হামলাকারী নাপিতকে ধরলেন, পেলেন ‘নায়ক’ খেতাব
বণিক বার্তা এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৯ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ২৩ হাজার ২৩৮ টন চিংড়ি রপ্তানি করেছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় ওই বছর রপ্তানি বেড়েছিল ৪ হাজার ৭ টন এবং আয় বেড়েছিল ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও বড় ধরনের পতন ঘটে। এক বছরের ব্যবধানে চিংড়ি রপ্তানি কমেছে ৪ হাজার ২৩৮ টন। সেই সঙ্গে, রপ্তানি আয়ও কমেছে ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ৪৪ কোটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার ডলারের হিমায়িত মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৪৪ কোটি ১৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক ৪২ শতাংশ। এর মধ্যে হিমায়িত চিংড়ি থেকে এসেছে ২৮ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলার, হিমায়িত মাছ থেকে ৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং অন্যান্য মৎস্যজাত পণ্য থেকে ৬ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানি বর্তমানে মূলত বাগদানির্ভর হয়ে আছে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলক কম দাম এবং বেশি উৎপাদনশীলতার কারণে ইউরোপ সহ বিভিন্ন বাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে চীন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পর্তুগাল, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো দেশে বাগদা চিংড়ির সীমিত চাহিদা রয়েছে। এর ফলে, চাহিদা কমে আসার কারণে এসব দেশে বাগদা আমদানিও প্রতি বছর কমছে।
আরও পড়ুন: দোকানে চুরির অভিযোগে ধাওয়া, পুলিশের গুলিতে প্রাণ গেল ১ বছরের শিশুর
বর্তমানে দেশে মোট ২ লাখ ৬২ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি চাষ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভেনামি চিংড়ির হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাগদার তুলনায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এক সময়ে দেশে ১২২টি প্রতিষ্ঠান চিংড়ি ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫টি প্রতিষ্ঠান। বাকিগুলোর বেশিরভাগ বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা কারখানা ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। এসব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ছিল চার লাখ টনের বেশি। ফলে, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামালের সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারছে না।
এমইউসি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস বলেন, বৈশ্বিক বাজারে চিংড়ি রপ্তানিতে বাংলাদেশ খুবই আগেই তার অবস্থান হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা বেশি থাকলেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ নিতে পারেনি। এখনো বাগদা চিংড়ি রপ্তানির কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় মৎস্য খাতে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। যদি সরকার নজর না দেয়, তাহলে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য চিংড়ি একসময় শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্ববাজারের চাহিদা বিবেচনায় ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনে বিভিন্ন দেশ বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া অন্যতম। দেশটির পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের পূর্ব সুম্বা জেলায় প্রায় ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে সরকারি উদ্যোগে ওয়াইংগাপু সমন্বিত চিংড়ি চাষ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পে বছরে প্রায় ৫২ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন এবং ৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টির আভাস, আবহাওয়া অফিসের তাপমাত্রা সংক্রান্ত বার্তা
দেশটির সরকারের বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা প্রায় ৩৯ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা ২২ কোটি ১৪ লাখ ডলারের উৎপাদনমূল্য অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ির দাম বেশি হওয়ার কারণে ভেনামির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। বলেন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম ছোট আকারের চাকা চিংড়ি প্রতি কেজি ৪ থেকে ৫ ডলারে বিক্রি করলেও বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে একই ধরনের চিংড়ির দাম ৭ ডলারের বেশি। দেশে চিংড়ির চাহিদা থাকায় উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
তারিকুল ইসলাম জহির জানান, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে মৎস্য খাতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এখন কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষে জমি কিনে বড় বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তাই সরকার যদি চিংড়ি চাষের জন্য জমি লিজ দেয়, তাহলে উদ্যোক্তারা সেখানে বিনিয়োগ করতে পারবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা মাঠপর্যায়ের চাষীদের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক ও বিনিয়োগ সহায়তা দেবেন এবং উৎপাদিত চিংড়ি কিনে নেওয়ার নিশ্চয়তাও দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তিন বিভাগ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন