০২:৫৬ পি.এম
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং শিগগিরই এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (১৫ জুন) ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে আলাপের সময় এ কথা তিনি বলেন।
চুক্তির কিছু বিষয় সামনে এনেছেন মার্কিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার (১৯ জুন) অর্থাৎ জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষরের দিন থেকেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া হবে। খবর বিবিসি’র।
এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি মূল স্তম্ভকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং তাকে নতুন একটি নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপের স্পিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, আলোচনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে
তবে প্রশ্ন উঠেছে, যিনি নিজেকে ওয়াশিংটনের ‘রাজনৈতিক পরামর্শদাতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং মার্কিন রাজনীতিবিদদের ওপর যার শক্ত প্রভাব ছিল, কীভাবে তাকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প ইরান চুক্তি করলেন এবং কীভাবে তিনি এভাবে প্রকাশ্যে ‘অপমানিত’ হচ্ছেন?
যিনি ইরানকে মোকাবিলার বিষয়টিকে ইসরাইলের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন, সেই নেতানিয়াহু এখন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে ইরান বরং যুদ্ধের আগের চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এছাড়া, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের দাবি এখন ইসরাইলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে, বিশেষ করে দেশটিতে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে। নেতানিয়াহুর সামনে এখন কোনো ভালো বিকল্পও নেই।
সোমবার ইসরাইলের সংসদ নেসেটে, বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, তার সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা– হয় আমাদের সবচেয়ে বড় মিত্রের সঙ্গে সরাসরি ও মারাত্মক সংঘাত, অথবা ইসরাইলি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন, রোববার (১৪ জুন) বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি। ট্রাম্পের এ বক্তব্য ইসরাইলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং গণমাধ্যম ভাষ্যকাররা লুফে নিয়েছেন। অক্টোবর মাসের আগে হতে যাওয়া নির্বাচন সামনে রেখে বিরোধীরা এখন এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন।
নিজের রাজনৈতিক দল লিকুদ এবং জোট সরকারের কট্টরপন্থি মন্ত্রীদের মন্তব্যেও নেতানিয়াহুর ওপর স্পষ্ট চাপ রয়েছে। বিশেষ করে তেহরানের দাবির বিষয়ে যে, যুদ্ধবিরতির আওতায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান’ বন্ধ থাকবে।
ইসরাইলের কট্টরপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের বাধ্য করে না। আমরা সে চুক্তির অংশীদার নই, যা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।’
মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন বলেন, আমেরিকানরা কেন এটি গ্রহণ করল তা বোঝা কঠিন। লেবাননে কী ঘটবে তা নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে হিজবুল্লাহকে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার এবং লেবাননের রাজনীতিতে হিজবুল্লাহকে প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: গণতন্ত্রের শর্ত ও রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্ব: তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক
নেতানিয়াহু নিজেও এখন অনেকটা নীরব। নিজেকে প্রায়শই জয়ী হিসেবে দাবি করতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর এ নীরবতাকে তার কঠিন পরিস্থিতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকেই। গাজায় হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল আরও আক্রমণাত্মক হওয়া, অর্থাৎ ঝুঁকিগুলোকে আটকে না রেখে সেগুলোকে পূর্বে নির্মূল করা।
কিন্তু ইসরাইলি বাহিনী গাজার অনেক এলাকা ধ্বংস করা এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করার পরেও হামাস এখনো অর্ধেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিজেদের শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
অন্যদিকে আট মাস আগের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঝুলে রয়েছে। নেতানিয়াহুর এ নতুন নিরাপত্তা কৌশল ইসরাইলি বাহিনীকে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখলে আটকে ফেলেছে। এটি অনেক ইসরাইলির কাছে জনপ্রিয় হলেও, এর কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক সমাধান নেই। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ যুদ্ধ ইসরাইলের সামরিক সম্পদ ও রিজার্ভ বাহিনীকে চরম ক্লান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বারবার সংঘাতে জড়ানো সত্ত্বেও নিজের প্রধান শত্রুদের এখনও নির্মূল করতে পারেনি ইসরাইল। বরং তেহরানকে আরও বেশি কট্টরপন্থি নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছে, যারা মার্কিন-ইসরাইলি শক্তির ভয় থেকে মুক্ত এবং হরমুজ প্রণালীতে তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে। এছাড়া, ইসরাইলের প্রধান শত্রু নিজেই ইসরাইলের মূল মিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে বলেও এখন দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ইসরাইলের এই ব্যর্থতা তেহরান-বিষয়ক কৌশল পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তাদের আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন যদি মনে করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ চুক্তিটি ভেস্তে দেয়ার প্রচেষ্টা, তবে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এছাড়া, ওবামা প্রশাসনের সময় নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে কংগ্রেস ও মার্কিন জনমতের মাধ্যমে নিজের কাজ হাসিল করার চেষ্টা করতেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ প্রায় নেই।
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, তার রাজনৈতিক দক্ষতা ও নীতি আঞ্চলিক হুমকি থেকে ইসরাইলকে রক্ষা করার সেরা উপায়। ইরানের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয়তো নেতানিয়াহুর এই রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী বয়ানকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু এর পরিবর্তে, তার নতুন নিরাপত্তা নীতি তাকে কোনো শত্রুর সঙ্গে নয়, বরং এক মিত্রের সঙ্গেই সংঘাত অথবা আত্মসমর্পণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান শাকিলের জানাজায় এমপির বিরুদ্ধে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন