১০:০৮ এম
ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতা পড়েনি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। কবির কল্পনায় এক ছেলে তার মাকে নিয়ে অনেক দূরের বিদেশে ঘুরতে যায়। মা যান পালকিতে। ছেলে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে তার পাশেই থাকে। পথে ডাকাত পড়লে ছেলে তাদের সাথে লড়াই করে মাকে রক্ষা করে। কবির সেই কল্পনাময় বীরপুরুষের সন্ধান মিলেছে নিউইয়র্কে।
কবির কল্পনার বীরপুরুষ ডাকাতদের সাথে লড়াই করলেও বাস্তবের বীরপুরুষ তার মাকে বাঁচাতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, এ ঘটনা ঘটে ভারতীয় কিশোর রোমাঞ্চ মহাজনের। বৃহস্পতিবার ঘটেছে ঘটনাটি, নিউইয়র্কের বিখ্যাত সেন্ট্রাল পার্কে। সত্যিকারের এই বীরপুরুষের নাম রোমাঞ্চ মহাজন।
বীরপুরুষ কবিতার ‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে’ মতো, মা, বাবা এবং ছোট ভাইয়ের সাথে প্রথমবারের মতো অনেক দূরের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে গিয়েছিলেন রোমাঞ্চ। বুধবার বিকেলে পরিবারের সবাই নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ঘুরতে গিয়েছিলেন। কবিতার সেই দৃশ্যের মতো রাঙা ঘোড়ায় নয়, তারা সবাই মিলে ঘোড়ার গাড়িতে চড়েছিলেন। একটি সময়ে গাড়ির চালক ছবি তোলার জন্য গাড়ি ছেড়ে একটু দূরে গিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে ঘোড়াটি পাগলের মতো ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে ঘোড়াটি ফুটপাথে উঠে পড়ে। চালকও সেই সময় চিৎকার করতে থাকেন গাড়ির পেছনে।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
এ সময় রোমাঞ্চের মা প্রিয়া মহাজন গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন। রোমাঞ্চ তৎক্ষণাৎ মাকে বাঁচাতে লাফ দেয়। হয়তো রোমাঞ্চও তখন সেই কবিতার মতো বলছিল, ’আমি আছি, ভয় কেন মা কর’। কিন্তু মাকে বাঁচাতে পারলেও রোমাঞ্চ নিজেকে বাঁচাতে পারেনি। দুর্ঘটনার ফলে তার মাথা সোজা রাস্তায় আঘাত করে, এবং ঘটনাস্থলে সে নিথর হয়ে পড়ে। বুধবার রাতে নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান ওয়েইল কর্নেল মেডিকেল সেন্টারে রোমাঞ্চের মৃত্যু হয়।
রোমাঞ্চের বাবা দীপক মহাজন বলেন, ’আমরা চিৎকার করে বলছিলাম, 'আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান!' পরিবারের সবাই একে অপরকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম।‘ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে শুধুমাত্র তার মাকে বাঁচানোর জন্য নিচে পড়ে যায়। সে চিৎকার করতে থাকছিল, 'মা!'।
দুর্ঘটনায় রোমাঞ্চের বাবা, মা এবং রোমাঞ্চের ছোট ভাই সামান্য আঘাত পেলেও তারা নিরাপদে আছেন। তবে প্রিয়জনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। মূলত পর্যটক আকর্ষণের কারণে ঘোড়ার গাড়িগুলো চালানো হয়। কিন্তু বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে ঘোড়ার গাড়ি চলাচল বন্ধের দাবি উঠেছে। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে সেন্ট্রাল পার্কের ভেতরে বা কাছাকাছি এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি সম্পর্কিত অন্তত ৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত মাসে একটি ঘটনায় একটি ঘোড়া অন্য একটি গাড়িকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে যায়।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
সিটি কাউন্সিলর ক্রিস্টোফার মার্তে বলেছেন, ’আমরা এটিকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না। এই ট্র্যাজেডি গণ্যমাত্রার জরুরি পদক্ষেপের দাবি রাখে, কাউন্সিল অবশ্যই সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’ তিনি ইতোমধ্যে একটি বিল এনেছেন, যাতে আগামী বছরের শেষের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করার দাবি করা হয়েছে।
ঘোড়ার গাড়ির চালকদের ইউনিয়নও এই দুর্ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে। ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়ন‘এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার কেম্প এক বিবৃতিতে বলেছেন, ’মনে হচ্ছে চালক তার ঘোড়া থেকে অন্তত এক হাত দূরে ছিলেন। এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো চালকেরই ছবির জন্য গাড়ি ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়, কখনোই না। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তকে সমর্থন করি।’ ইতোমধ্যে গাড়ির চালককে অনির্দিষ্টকালের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে চালকের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন