ঢাকা শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

‘বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ভিত্তি ন্যায্যতা থাকবে না’


‘বিপ্লব অস্বীকার করলে ক্ষমতার ভিত্তি ন্যায্যতা থাকবে না’

 

মাহমুদুর রহমান

আজ পহেলা জুলাই। ঠিক দুবছর আগে এই দিনে আমাদের লড়াকু ছেলেমেয়েরা সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল; যার পরিণতিতে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ফ্যাসিস্ট শাসককে দেশ থেকে পালিয়ে দিল্লিতে তার প্রভুর চরণে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

আরও পড়ুন: সুষ্ঠু নির্বাচনকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করছে জামায়াত: রুহুল কবির রিজভী

আমি তখন ইস্তান্বুলে নির্বাসিত জীবনযাপন করছি। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে আমি ভেবেছিলাম আগের কোটা আন্দোলনের চেয়ে বেশি কিছু প্রাপ্তি এবারও ঘটবে না। কিন্তু অতিদ্রুত কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংকীর্ণ বয়ান বৃহত্তর বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষার দিকে ধাবিত হলে আশান্বিত হয়ে উঠলাম।

আন্দোলনকারীদের এক অংশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রথমে অবৈধ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও পুলিশের আইজির পদত্যাগ, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ এবং পর্যায়ক্রমে সরকার পতনের এক দফা দাবির পরামর্শ দিয়েছিলাম। যেহেতু আমি দেশের বাইরে ছিলাম, কাজেই মাঠের প্রকৃত উত্তাল চিত্র আমার জানা ছিল না।

এ প্রজন্মের অসীম সাহসিকতার মাত্রাও দূরে থেকে উপলব্ধি করতে পারিনি। আন্দোলনের গতি আমার ধারণাকে ছাড়িয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করা আবু সাঈদের অবিস্মরণীয় শাহাদতের দৃশ্যে আমার মনে হয়েছিল এবার আর সম্ভবত শেখ হাসিনার শেষরক্ষা হবে না।

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে তুরস্কের প্রখ্যাত মিডিয়া ‘ইয়েনি শাফাক’-এর স্টুডিওতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে আমার একটি একক বক্তৃতা ছিল। সেখানে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলাম, শুধু ভারতের সমর্থনের জোরে জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনার সরকার আর বেশিদিন টিকতে পারবে না। তার পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনাদের সবারই জানা।

আরও পড়ুন: নেতানিয়াহু হেরে গিয়ে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান, দাবি বিরোধীদের

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ছয় বছরের নির্বাসন শেষে তরুণ বিপ্লবীদের প্রতি অগাধ স্নেহ আর অপরিসীম শ্রদ্ধার যুগপৎ অনুভূতি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আমার প্রত্যাশা ছিল বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে অন্যসব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে পাব। আমি রাজনীতিবিদ নই বলেই হয়তো বোকার মতো একেবারেই অবাস্তব স্বপ্ন দেখেছিলাম। দেশে ফিরে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। দেখলাম, ক্ষমতায় যাওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।

ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে তারা পরস্পরের ছিদ্রানুসন্ধানে ব্যস্ত। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করার জরুরি দাবিটিও আমাকে উত্থাপন করতে হয়েছিল। ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের প্রায় সমাপ্তি পর্যন্ত দুই দফার বন্দিজীবনে যাদের দিনের পর দিন জেলখানায় এক পাতে খেতে দেখেছিলাম, ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে দিনরাত বিষোদ্গার করছেন। ১৫ বছর যারা একই ধরনের মজলুম ছিলেন, তারা একে অন্যকে যথাক্রমে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী এবং রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী বলে গালমন্দ করছেন।

প্রসঙ্গক্রমে পুরোনো কথা বলছি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী এবং বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনরত আমি এবং তৎকালীন কৃষি প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিলে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণের এক ব্যতিক্রমধর্মী মেলার আয়োজন করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই উদ্যোগে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন এবং নিজে চীন মৈত্রী হলে মেলার উদ্বোধন করেছিলেন।

সেই সূত্র ধরেই বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল। বিনিয়োগ বোর্ডের অফিসেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। এরপর তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থানের অনেক ঘটনাই আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার মনে পড়ছে না তিনি ‘রাজাকার মন্ত্রীর’ অধীনে প্রতিমন্ত্রিত্ব নিয়ে কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। চলমান সংসদেও তিনি নিজামীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু যখন সেই আলমগীর ভাইকে বাংলাদেশে মৌলবাদের কথিত উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে একেবারে আওয়ামী বয়ানে বক্তব্য দিতে শুনি, তখন বড়ই আশ্চর্য হই। মুদ্রার অপর পিঠের কাহিনিও আছে।

আরও পড়ুন: ঢাকায় আন্তর্জাতিক নারী সংসদ ও আইকনিক উইমেন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ অনুষ্ঠিত

আমার প্রায় পাঁচ বছরের জেল জীবনের অধিকাংশ সময় কাশিমপুর দুই নম্বর জেলে কেটেছে। সেই দীর্ঘ সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুস সালাম পিন্টু, রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিসহ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী একই জেলে বন্দি ছিলাম। জামায়াত নেতাদের মধ্যে মীর কাসেম আলী তিনতলায় আমার পাশের সেলে প্রায় দুবছর ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর ওই একই সেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার থেকেছেন। বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানও ওই সেলে বন্দি ছিলেন। জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যন্ত প্রায় এক বছর একই বিল্ডিংয়ের দোতলার সেলে থাকতেন।

তিনি আমাকে বুড়ো বয়সে পবিত্র কোরআন শরিফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। আর একজনের কথা না বললেই নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আমাদের বিল্ডিংয়ের তিনতলায় আরেক প্রান্তের সেলে থাকতেন। মামুনের সেলেই আমরা জামাতে নামাজ পড়তাম। মীর কাসেম আলী নামাজে ইমামতি করতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

মামুনের সেলের সামনের বারান্দায় আমাদের তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। সপ্তাহে এক দিন আমরা বাসা থেকে খাওয়া পেতাম। এছাড়া জেল কর্তৃপক্ষে আমাদের আলাদা রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। একজন কারারক্ষী আমাদের টাকায় বাজার করে আনতেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এসব কিছু দেখাশোনা করতেন। জেলে রান্না করা এবং সবার বাসা থেকে আনা সাপ্তাহিক খাবার আমরা ভাগ করে খেতাম। তখন কিন্তু কোনো জামায়াত নেতাকে বলতে শুনিনি যে, আমরা কোনো চাঁদাবাজের বাসা থেকে আনা অথবা তার টাকায় কেনা খাবার গ্রহণ করব না। রাজাকার ও চাঁদাবাজরা যে একে অপরের দৃষ্টিতে অস্পৃশ্যÑ সেটি আজকের ক্ষমতাবান নেতাদের বোধ হয় ফ্যাসিস্ট আমলে কারাগারে স্মরণে ছিল না।

রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একে অপরকে গালাগাল করবেন; আবার বিপদে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই গালাগালি ছেড়ে গলাগলি করবেনÑ এতে আমাদের মতো আমজনতার কিছু যায়-আসে না। বরং এদের কাজকারবারে আমরা বেশ আমোদ অনুভব করি। কিন্তু তারা এত তাড়াতাড়ি যেভাবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তনের রাস্তা নির্মাণ করছেন, সেটি বিপজ্জনক। ভাই, ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ভালো কথা।

আরও পড়ুন: রোববার থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন শুরু: শ্রমমন্ত্রী

কিন্তু আপনাদের কর্মকাণ্ডে যদি কোনোভাবে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বৈধতার সংকট তৈরি হয়, তাহলে আপনারা তো বিপদে পড়বেনই, সেই সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের অধিকারও আবার হুমকির মুখে পড়বে। ৩৬ জুলাই না ঘটলে আজকের সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনোটাই সৃষ্টি হতো না। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আপনাদের বিভাজনের সুযোগে এদেশের চিহ্নিত ভারতপন্থিরা আবার ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছে? দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার হুমকি দেওয়ারও সাহস পাচ্ছে!

এদিকে সুশীলরা ফতোয়া দিচ্ছেন, স্বাধীনতার পর থেকে সব সন্ত্রাসের হোতা আওয়ামী লীগকে আর ‘সন্ত্রাসী’ বলা যাবে না। অথচ ব্যক্তিসন্ত্রাস থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, জনগণের ওপর যাবতীয় নির্যাতনের পন্থা আওয়ামী কারখানা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল যেমন আওয়ামী ‘প্রডাক্ট’ ছিল, একইভাবে এ শতাব্দীতে আওয়ামী ঘরানা থেকেই ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে। শেখ মুজিব রক্ষীবাহিনী দিয়ে যে গুমের জন্ম দিয়ে গিয়েছিলেন, তাকেই শেখ হাসিনা ডিজিএফআই এবং র‍্যাবকে ব্যবহার করে আরো ব্যাপক ও নির্মমভাবে প্রয়োগ করেছেন।

‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামী বয়ান তৈরির জন্য দুর্নীতির কথিত সূচককে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে সব আমলেই দুর্নীতি হয়েছে। ড. ইউনূসের আমলও দুর্নীতিমুক্ত ছিল না। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট জমানায় দুর্নীতি যে মাত্রায় উঠেছিল, তার সঙ্গে এ যাবৎ অন্য কোনো আমলের তুলনা হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের তথাকথিত সুশীল সমাজ সে সময় ভয়ানক সব দুর্নীতি দেখেও না দেখার ভান করেছে।

একের পর এক ব্যাংক দখল হয়েছে এবং আমানতকারীদের লাখো-কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে; অথচ সুশীলরা নীরব থেকেছেন। তারা নাকি যুক্তি দিতেন, শেখ হাসিনা খারাপ হতে পারেন; তবে দেশের অন্য যেকোনো নেতার তুলনায় তিনি মন্দের ভালো। ফ্যাসিস্ট আমলে তারেক রহমান সম্পর্কে তারা কী বলতেন, সেটি লিখে বোধ হয় আজ আর কোনো লাভ নেই। ক্ষমতা প্রাপ্তির আনন্দে বিএনপি নেতারা সেগুলো শুনতে আগ্রহী নন। শুধু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আপনারা নতুন বন্ধুরা ২০০১ থেকে টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশের ললাটে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ রাষ্ট্রের তিলক পরিয়ে দেওয়ার অনুঘটক ছিলেন। দুদিন আগে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতির অনুসন্ধান দুদক দিয়ে করানোর জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ৩০ লাখ টাকা দিয়েও দালালদের হাত থেকে তাকে বাঁচানো যায়নি, এখন...

অথচ আজ পর্যন্ত বিএনপির কোনো মন্ত্রীর মুখে আওয়ামী আমলের দুর্নীতির অনুসন্ধানের কথা শুনিনি। বরং শেখ পরিবার, অলিগার্ক ও আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস আমলের সব অনুসন্ধান এখন দুদকে বাক্সবন্দি হয়ে আছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে, সুশীলদের মতো বিএনপির শীর্ষ নেতারাও বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা অন্যদের, এমনকি তাদের চেয়েও ভালো ছিলেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কদিন আগেই বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মহানুভবতার সঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের জুলুম জাতিকে ভুলে যেতে বলেছেন।

সব মজলুম তার মতো এতটা মহৎ নাও হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেখেও মনে হচ্ছে তিনি বাংলাদেশের ‘মন্দের ভালো’ এবং ‘আগেই ভালো ছিলাম’-মার্কা আওয়ামীপন্থি সুশীল সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে অধিকতর আগ্রহী। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রী কোন রাজনীতিচর্চা করবেন কিংবা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন, সেসব একান্তই তার বিবেচনা। আমাদের মতো আদার ব্যাপারীর সেই জাহাজের খবর নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামে যৎকিঞ্চিৎ ভূমিকার কারণে হয়তো আজকের বিশেষ দিনে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা বলার অধিকার দাবি করতে পারি।

৩৬ জুলাইকে আমি প্রথমাবধি বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখায় ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছি। ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আমার অন্যতম নালিশ ছিল যে, তিনি বিপ্লবী সরকার গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার সুশীল সমর্থকরা জুলাইকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। বাংলাদেশের মিডিয়ায় ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ভারতপন্থি বাম তাত্ত্বিকরাও জুলাইকে ভয়ানক অপছন্দ করেন। কারণ, তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এটি একটি ইসলামপন্থি অভ্যুত্থান ছিল।

মব সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামপন্থা জুড়ে দিয়ে এরা হাসিনার পতনের বিপক্ষে দেশ-বিদেশে বয়ান উৎপাদনের চেষ্টা করে চলেছেন। যে চিহ্নিত গোষ্ঠী একসময় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ আবিষ্কার করে হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করত, তারাই ড. ইউনূসের আমলে মৌলবাদ ও উগ্রবাদের উত্থান খুঁজে পেয়েছিল। এখন আবার নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। জুলাইকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি দল বিএনপি বেশ সমস্যায় পড়ে যায়। কারণ, তারা বিপ্লবের প্রধান উপকারভোগী। হাসিনার পতনের পর দলে ‘গুপ্ত জামায়াতের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে গিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব ‘গুপ্ত আওয়ামীদের’ জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। এ কারণে গত প্রায় দেড় বছরে বিএনপি নেতাদের বয়ানের মধ্যে উপরোক্ত বাম ও আওয়ামীকরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তারা নাকি বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান দেখছেন।

আরও পড়ুন: মাদকাসক্তি প্রতিরোধে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই: শিক্ষামন্ত্রী

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপির আবেগাপ্লুত প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারা গত দুবছরে অনেকটাই সরে এসেছেন। নিজেদের সেসব বক্তব্য আবার শুনলে পার্থক্যটা তারা নিশ্চয়ই ধরতে পারবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আপত্তিকে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি একেবারে অযৌক্তিক মনে করি না।

কাজেই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ অপ্রত্যাশিত নয়। তবে সনদ বাস্তবায়নের ভয়ে খোদ জুলাই বিপ্লবকে ছোট করে দেখার মনোভাব সরকারি দলের নেতাদের আপন স্বার্থেই পরিত্যাগ করা উচিত। বিএনপির জুলাই নিয়ে বয়ান আওয়ামী প্রোপাগান্ডা ও ভারতপন্থি বাম ঘরানার তাত্ত্বিক বয়ানের সঙ্গে মিলে গেলে শেখ হাসিনার পতনের প্রক্রিয়াই যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়— সেটি আশা করি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবেন। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন কি করেননি— এ বিতর্ক যারা তোলেন, তাদের উদ্দেশ্য সরকার বুঝতে না পারলে আখেরে তারাই পস্তাবেন। এক-এগারো থেকে কোনো শিক্ষা বিএনপি নিয়েছে কি না— সেটিও আমার জানা নেই।

মোট কথা, ৩৬ জুলাই ঘটিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির যে সুযোগ আমাদের তরুণরা সৃষ্টি করেছে, তাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কেউ ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে আর কেউ যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই করতে গিয়ে জুলাইয়ের মর্যাদাহানি করে উভয় গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের ও জনগণের জন্য বিপদ তৈরি করছে। ইতিহাস আপনাদের এই সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরতাকে ক্ষমা করবে না।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল মেক্সিকো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বুধবার, ১ই জুলাই, ২০২৬ ইং

১২:১৫ পি.এম


শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল মেক্সিকো

 

মেক্সিকো কেঁপে উঠেছে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে। মঙ্গলবার বাজা ক্যালিফোর্নিয়া উপদ্বীপের কিছু অংশে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে ভূমিকম্পটি ঘটে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল এল প্রোগ্রেসো থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর এখনও পাওয়া যায়নি।

ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৬ মাইল গভীরে সংঘটিত হয় এবং মেক্সিকোর সিনাওলা রাজ্যের লস মোচিস ও কুলিয়াকান শহরে হালকা কম্পন অনুভূত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্পের আক্রমণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় একটি ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প এবং ৩৯ সেকেন্ড পর ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এ ঘটনাগুলিকে 'ডাবলেট' বলা হয়।

ডাবলেট বলতে বোঝায় কাছাকাছি সময়ে প্রায় একই মাত্রার দুটি ভূমিকম্প হওয়া, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে আরও বৃদ্ধি করে দিতে পারে।

ইউএসজিএস জানিয়েছে, ১৯ থেকে ২৬ জুনের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৪ দশমিক ৫ বা তার চেয়েও বেশি মাত্রার ৯৩টি ভূমিকম্প ঘটেছে। এটি বিশ্বব্যাপী ভূমিকম্পের তৎপরতা বৃদ্ধির একটি সতর্ক সংকেত।

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় রেডউড ভ্যালির কাছে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার একটি মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পও অনুভূত হয়েছে। এর কেন্দ্রস্থল ছিল মেনডোসিনো কাউন্টিতে, যেখানে ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৫ মাইল নিচে আঘাত করে।

সূত্র: ফক্স নিউজ

 

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

হান সেওং-সুক দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বুধবার, ১ই জুলাই, ২০২৬ ইং

১২:১৭ পি.এম


হান সেওং-সুক দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী

দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হান সেওং-সুকের নিয়োগে অনুমোদন দিয়েছে দেশটির জাতীয় সংসদ। ৩০ জুন, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ভোটে তার নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়।

প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে পরিচিত হান সেওং-সুক এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নাভেরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা পরিচালনায় তার দক্ষতা দেশজুড়ে প্রশংসিত।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে, তিনি বর্তমান রাষ্ট্রপতি লি জে মিয়ংয়ের সরকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। ওই দায়িত্বে থাকাকালে, তিনি শিল্প খাতের উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও করপোরেট খাতে হান সেওং-সুকের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি, শিল্পনীতি এবং উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব আনতে পারে। তার নিয়োগকে দেশটির প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে মুহূর্তেই হারাল ২৫ পরিবারের ঠিকানা, আতঙ্কে তীরবর্তী মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

বুধবার, ১ই জুলাই, ২০২৬ ইং

১২:২১ পি.এম


ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে মুহূর্তেই হারাল ২৫ পরিবারের ঠিকানা, আতঙ্কে তীরবর্তী মানুষ

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত তিন দিনে অন্তত ৫০ পরিবারের বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আধা ঘণ্টার ব্যবধানে ২৫ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অব্যাহত ভাঙনে শতশত একর আবাদি জমি হারিয়ে নদীপাড়ের মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। তীব্র ভাঙনের কারণে আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে তীরবর্তী মানুষ।

জানা গেছে, চিলমারী ইউনিয়নের কয়েকটি স্থানে গত তিন দিন ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের এই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে বিশারপাড়া আশ্রয়ণ এলাকায় সোমবার ভোরবেলায় ৩০ মিনিটের ভাঙনে ২৫ বাড়িসহ গত তিন দিনে অন্তত ৫০টি পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক লাইনের ছয়টি খুঁটি এবং শত শত একর আবাদি জমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে মনুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল বাজার, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ইউনিয়নের শাখাহাতী, কড়াইবরিশাল, বিশারপাড়া আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই নদী গিলে খাচ্ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। ভাঙনের ফলে স্থানীয় আতিকুর রহমান, আনসার আলী, আ. হামিদ, বক্কর আলী, লাল মিয়া, শাহিন মিয়া, ফুলু মিয়া, মোনছোর মেম্বারসহ অনেকে ভিটেবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। এছাড়া বৈদ্যুতিক খুঁটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার কারণে প্রায় ৪০০ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। এই ঘটনার সময় ভাঙনের মুখে থাকা বাড়িঘর সরিয়ে নিতে দেখা যায় ভুক্তভোগীদের।

বিশারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহিন মিয়া, তোফায়েল হোসেন এবং মুকুল মিয়া বলেন, 'ব্রহ্মপুত্র নদ আমাদের বসতবাড়ি কেড়ে নিয়েছে। সাজানো সংসার হারিয়ে ফেলেছি। লাখ লাখ টাকার সম্পদ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা এখন মানবেতর জীবন যাপন করছি। ত্রাণ চাই না, চাই নদীভাঙন থেকে স্থায়ী রক্ষা।'

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুই বছরে ইউনিয়নের প্রায় ৬৫০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে যে হারে ভাঙন চলছে, তাতে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে ইউনিয়নের বড় একটি অংশ, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আশ্রয়কেন্দ্র ও কড়াইবরিশাল বাজার নদীতে চলে যাবে। ইতিমধ্যে শত শত একর আবাদি জমিও বিলীন হয়েছে।'

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ব্যাপক ভাঙন আসলে সামান্য কিছু দিয়ে রক্ষা করা কঠিন। ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হবে তিনি জানান।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, চরাঞ্চলের এত দীর্ঘ ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ভাঙন প্রতিরোধে প্রাথমিকভাবে মাত্র ১ হাজার ৫০০টি জিও বস্তা দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। তাই ভাঙনের মুখে থাকা স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বাংলাদেশ তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে; কারও নাক গলানো হবে শিষ্টাচারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এম এ সাঈদ

বুধবার, ১ই জুলাই, ২০২৬ ইং

১২:২৫ পি.এম


বাংলাদেশ তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে; কারও নাক গলানো হবে শিষ্টাচারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন

বাংলাদেশ তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে; কারও নাক গলানো হবে শিষ্টাচারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন


দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বাস্তবতা এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—বাংলাদেশ আর সেই রাষ্ট্র নয়, যাকে পুরোনো মানসিকতার চশমা দিয়ে দেখা যাবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিটি সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে "প্রতিবেশীর অনুমোদনসাপেক্ষ" বলে ধরে নেওয়ার যুগ শেষ হয়ে এসেছে।

অনেক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা নিরাপত্তা কৌশল নিয়ে কিছু প্রতিবেশী দেশ প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে মন্তব্য করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম একটাই—সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত সেই রাষ্ট্রই নেবে। অন্য কোনো দেশের প্রত্যাশা বা অস্বস্তি সেই সিদ্ধান্তের মাপকাঠি হতে পারে না।

আজকের বাংলাদেশ কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রাষ্ট্র। বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী। ফলে বাংলাদেশের কূটনীতি এখন বহুমাত্রিক। এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান—এমন সেকেলে ধারণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আর কার্যকর নয়।
যে রাষ্ট্র নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, সে রাষ্ট্র কখনো একক নির্ভরশীলতার ফাঁদে আটকে থাকে না। বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাংলাদেশের জন্যও সেটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। কারণ জাতীয় স্বার্থ কোনো স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষকে চেনে না; চেনে কেবল স্থায়ী স্বার্থকে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব অবশ্যই কাম্য। কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো আধিপত্যের সমার্থক হতে পারে না। সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ওপর যে সম্পর্ক দাঁড়ায়, সেটিই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে, যদি কেউ মনে করে বাংলাদেশের প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাদের মতামতই শেষ কথা হবে, তবে সেটি কূটনৈতিক বাস্তবতার নয়, অতীতের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখতে চায় এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা কোনো একক শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এই নীতিই বাংলাদেশকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হলো—প্রতিটি রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে নিঃশর্তভাবে সম্মান করা। বাংলাদেশ যেমন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি সমর্থন করে না, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে অযাচিত চাপ বা মন্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার কূটনৈতিক পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে। এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে সংকীর্ণ প্রতিযোগিতার চোখে দেখা ভুল হবে। কারণ একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজের স্বার্থের পক্ষে।

যারা এখনো মনে করেন, বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপে তাদের "নাক গলানোর" পুরোনো অভ্যাস বহাল থাকবে, তাদের উপলব্ধি করা উচিত—এটি আর আগের বাংলাদেশ নয়। স্বাধীন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত স্বাধীন রাষ্ট্রই নেবে। পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব টিকে থাকে; আধিপত্যের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত কেবল অবিশ্বাসই সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়। এটি জনগণের অর্জন, সংবিধানের অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রশ্ন। সেই মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের, আর সেই মর্যাদাকে সম্মান করার দায়িত্ব প্রতিবেশীসহ সকল অংশীদার রাষ্ট্রের।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট  

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৭
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৪
মাগরিব ০৫:২০
ইশা ০৬:৩২
সূর্যোদয় : ০৬:০৪ সূর্যাস্ত : ০৫:২০
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%