১০:৩০ এম
বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ পাঁচ মাসের যুদ্ধেও ইরানের সামরিক সক্ষমতার সামান্য কোন কমতি কিংবা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়নি বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে তাদের শক্তিশালী অবস্থান আরো শক্তিশালী অবস্থার জানান দিচ্ছে। এর একমাত্র কৌশল হচ্ছে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, অত্যাধুনিক সামরিক শিল্পকারখানা তৈরি এবং তা নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত না করে গোটা রাষ্ট্রেই ছড়িয়ে রাখা। এক সপ্তাহে ইরান ধ্বংসের লক্ষ্যে যুদ্ধে নামা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরিকল্পনায় পানি ঢেলে দেয়া কৌশলই হচ্ছে ইরানের মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম। যা বিশ্ব পরাশক্তির সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধেও পাঁচ মাসের যুদ্ধের পরেও একই শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপরাজিত চ্যালেঞ্জের নাম।
কারণ কি? কারণ একটাই, ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাকের শক্তিশালী নেতা সাদ্দাম হোসেনের শাসনকে মাত্র ২৬ দিনের মাথায় ধ্বংস করে ইরাককে পরাস্ত হতে দেখেছিল। এটি দেখেই ইরান শিক্ষা নিয়েছিল যে, একটি রাষ্ট্রের শক্তিশালী সরকারও কিভাবে শত্রুর হামলায় পরাস্ত হয়। ফলে তারা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক কাঠামোতে নতুন সিস্টেম চালু করে। যেখানে দেশের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত সামরিক শক্তিকে দেশের বিশেষ কোন স্থান বা কয়েকটি স্থানে সীমাবদ্ধ না রেখে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্টসহ ব্যবহৃত যাবতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও দেশপ্রেমিক বাহিনীর সক্ষমতাকে গোটা দেশে ছড়িয়ে রাখা। ইরান প্রত্যেক অঞ্চলে তাদের সামরিক সক্ষমতা কে আলাদা আলাদা করে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য কমান্ডারদের হাতে যুদ্ধের ভার ছেড়ে দিয়েছে এবং সেখানেও চার স্তরীয় কমান্ড ব্যবস্থা তৈরি করেছে। যাতে শীর্ষ পর্যায়ের কারো মৃত্যু কিংবা ক্ষতি হলে তার পরের স্তর থেকে কমান্ডের দায়িত্ব ধারাবাহিকভাবে অন্যরা নিতে পারে। এই কৌশলই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বিশ্ব পরাশক্তিকে দীর্ঘ পাঁচ মাসের যুদ্ধে নাকানি চুবানি খাইয়ে ছাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, ইরান এমন প্রতিরোধ বলয় তৈরি করে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে যাতে করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ব পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে।
বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনা করে শত্রুর হুমকি মোকাবেলায় দেশের সামরিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত যাতে তা দেখে শত্রুরা শ্যেন দৃষ্টিতে তাকাতেও শতবার ভয় পায়। বিশ্বের এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কি করবে? তার আগাম প্রস্তুতি নেয়া এখনই জরুরি নয় কি।
কারণ, বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান, রাজনৈতিক এমনকি ভূ কৌশলগত পরিস্থিতির কারণে অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে। তাই ইরানের অনুকরণে একই রকম দেশ প্রেমিক ও পরীক্ষিত, শত্রু রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা যারা কখনোই প্রভাবিত হয়নি এমন শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কর্তা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে ৫ স্তরীও মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম তৈরি করা অত্যন্ত জরুরী।
বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—শুধু বড় অস্ত্রভাণ্ডার নয়, দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে সেই রাষ্ট্র, যে যুদ্ধের আগেই নিজের প্রতিরক্ষাকে এমনভাবে সাজিয়ে রাখে যাতে শত্রু আঘাত করলেও রাষ্ট্র ভেঙে না পড়ে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় নির্ধারণ করে কেবল ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র নয়; নির্ধারণ করে একটি দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা, বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের কথিত "মোজাইক ডিফেন্স" কৌশল আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এই ধারণার মূল কথা হলো—রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাকে এমনভাবে বিকেন্দ্রীভূত করা, যাতে একটি বা কয়েকটি স্থাপনা ধ্বংস হলেও পুরো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে না যায়। অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একটি বিশাল দুর্গ নয়, বরং অসংখ্য ছোট ছোট অথচ শক্তিশালী ইটের সমষ্টির মতো দূর্গে পরিণত করা।
বাংলাদেশের জন্য এই ধারণা কেবল একটি বিদেশি সামরিক তত্ত্ব নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চিন্তার বিষয়। কারণ ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনাও সময়োপযোগী হওয়া জরুরি।
আজকের যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে হয় না। সাইবার আক্রমণ, ড্রোন, দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার—এসবই যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে যদি একটি দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘাঁটি বা কেন্দ্রীয় অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে প্রথম আঘাতেই বড় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ কারণেই বাংলাদেশের উচিত এমন একটি প্রতিরক্ষা দর্শনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, প্রতিরক্ষা খাতে বড় ধরনের বাজেট দেয়া এবং ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ম্যানপ্যাড, অত্যাধুনিক ও পরীক্ষিত ফোর পয়েন্ট ফাইভ জেনারেশনের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়াক্রাফট সহ যাবতীয় সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাস্তবায়ন, সংক্রান্ত আলোচনা বা চুক্তিগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটানো।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে রাষ্ট্র সময়ের পরিবর্তন বুঝতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্রের মূল্য দিতে হয় অনেক বেশি। তাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনাও আগামী দশকের চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। প্রতিরক্ষা কেবল সেনাবাহিনীর বিষয় নয়; এটি অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিল্প, যোগাযোগ, জ্বালানি, তথ্যব্যবস্থা এবং জাতীয় সক্ষমতার সমন্বিত রূপ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নীতি চিরকাল সত্য—যুদ্ধের প্রস্তুতি যত শক্তিশালী, যুদ্ধের সম্ভাবনা তত কম। কারণ শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা সম্ভাব্য আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করে।
বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাস করে, কিন্তু শান্তি টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি অপরিহার্য। তাই সময় এসেছে ভবিষ্যৎমুখী, বিকেন্দ্রীভূত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্থিতিস্থাপক প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর আলোচনা শুরু করার। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক শর্ত।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন