০৭:২৯ পি.এম
ঢাকা, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ : সরকারের পক্ষ থেকে দেশের অর্থায়ন কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর জন্য বিকল্প অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে, দেশে বিনিয়োগের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক, জেপি মরগান ও গোল্ডম্যান স্যাকসসহ একাধিক বড় বিদেশি ফান্ড ম্যানেজার বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
আজ (রোববার) রাজধানীর একটি হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বিল্ডিং ইনভেস্টরস কনফিডেন্স: ফ্রম পলিসি রিফর্ম টু ইফেকটিভ ইমপ্লিমেন্টেশন’ শীর্ষক মধ্যাহ্নভোজের সভায় দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়ার সময়ে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: হবিগঞ্জে ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা মোটেও সঠিক নয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত সাধারণত স্বল্পমেয়াদী হলেও, তারা দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ করছে। তবে, বড় বিনিয়োগের অর্থায়ন পুঁজিবাজারের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বিশ্বব্যাপী আর্থিক কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থার মধ্যেই আটকে আছে। এজন্য সরকার বিকল্প অর্থায়ন খুঁজছে এবং ভবিষ্যতের জন্য অর্থায়নের কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও নতুন অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধান চলছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে বিকল্প অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপ‚র্ণ।
আমীর খসরু বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ বহু আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের আর্থিক পণ্য ব্যবহার করছে, কিন্তু বাংলাদেশ সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। যাহোক, এখন সেই পরিবর্তন শুরু হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বন্ডের সুদের হার ব্যাংক ঋণের সুদের হারের তুলনায় কম। এ ছাড়া, ইকুইটিভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগও রয়েছে। ফলে অর্থায়নের ব্যয় কমিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী: বিএনপি জুলাইকে ধারণ করছে, জনগণের সমর্থন নিয়ে চলছে সরকার
পুঁজিবাজার নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিবর্তন এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিধিবিধানের সংস্কারের ফলে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মাঝে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, বিদেশি ফান্ড ম্যানেজারদের কাছ থেকে সরকার ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। এক বা দুইজন নয়, বরং বেশ কয়েকজন বড় ফান্ড ম্যানেজার বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সাথে, জেপি মরগান ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় বিনিয়োগ ব্যাংকও বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহী হয়েছে।
তবে, অর্থমন্ত্রী মনে করেন, দেশের বাজার মূলধন এখনো অনেক ছোট। সেকারণে আরো অধিক কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে।
ব্যাংক খাতের সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষভাবে বেশ কিছু ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে পার করছে। এসব ব্যাংকে মারাত্মক মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থপাচার এবং উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দ্রুত শুনানির আবেদন আপিল বিভাগে
এছাড়া, অনেক আমানতকারী তাঁদের অর্থ তুলতে পারছেন না। আবার অনেক ব্যবসায়ী কার্যকর মূলধন, ঋণপত্র খোলা এবং অন্যান্য অর্থায়ন সংক্রান্ত সমস্যায় পড়ছেন। এর ফলে, ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণ বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং সরকারি সহায়তা, উদ্ধার তহবিল এবং অন্যান্য পুনঃমূলধনীকরণ কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কর ব্যবস্থার সংস্কারের পরিকল্পনাও প্রতিপন্ন করেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর কথায়, ব্যবসায়ীদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো কর ব্যবস্থার জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি এবং দুর্নীতি। এইসব সমস্যা দূর করে কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের তুলনায় ও আঞ্চলিক মানদণ্ডে কম। এজন্য, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি অংশ নীতিনির্ধারণ করবে, অন্য অংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
আরও পড়ুন: কাপ্তাইয়ে অনুষ্ঠিত হলো দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক কর্মশালা
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে একই ব্যক্তিরা করনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করতেন। নতুন ব্যবস্থায় করনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়া হবে, যাতে নীতিনির্ধারণের সময় ব্যবসা, করদাতা, রাজস্ব আহরণ এবং ভোগব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরো জানান, পুরো কর ব্যবস্থাকে স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যদিও এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তবুও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়তা বাস্তবায়িত হবে। যাতে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া থেকে শুরু করে কর ফেরত পাওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম অনলাইনে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশন নীতির প্রসঙ্গও ওঠে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে অতিনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পুরো প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন হয়েছে।
তিনি আরো জানান, খুব শীঘ্রই একটি ওয়েবসাইট চালু হবে, যেখানে ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকরা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের বাধার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন। সরকার প্রতিদিন এসব অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করবে।
আরও পড়ুন: সর্বজনীন পেনশনে সুখবর, গ্রাহকেরা লাভবান হবেন ১১.৬৮% থেকে ১১.৭২% মুনাফায়
রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সরকারের নতুন নীতির কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী। তৈরি পোশাকের খাতের বাইরে সকল উদ্যোক্তারা যেসব রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ করতে চান তাদেরকে শুল্কমুক্ত বন্ডেড লাইসেন্স প্রদান করা হবে।
তিনি বলেন, নতুন কোন রপ্তানির পণ্য নিয়ে কেউ আসলে, তিনি বন্ডেড গুদাম সুবিধা, করমুক্ত সুবিধা এবং প্রয়োজন অনুসারে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের সুবিধা পাবেন। যারা বন্ডেড গুদাম ব্যবহার করতে চান না, তারা ব্যাংক গ্যারান্টির আওতাধীন একইরকম সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সমস্যা নিয়েও আলোচনা করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থনীতির অগ্রগতি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। যদিও এসব সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান খুব দ্রুত সম্ভব নয়।
তিনি জানান, গ্যাস খাতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়গুলোতে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন বাড়লেও, সঞ্চালন ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আরও পড়ুন: চান্দিনায় নির্যাতনে গৃহবধূর মৃত্যু, স্বামী পলাতক; তদন্ত শুরু
আমীর খসরু বলেন, সরকার একটি সমন্বিত জ্বালানি কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস এবং কয়লাভিত্তিক জ্বালানির মধ্যে সমন্বয় থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য শক্তিশালী ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সরকার কোন সমস্যা সমাধানের দাবি করছে না। তবে সরকার সবসময় ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধানে আলোচনার জন্য প্রস্তুত এবং যেকোনো যৌক্তিক সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল এবং এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান প্রমুখ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন