০৯:৫২ পি.এম
শিশুদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের নিয়মে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে মেটা। শিশু ও কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আরও নিরাপদ করতে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে করা ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার অংশ হিসেবে একাধিক নতুন ব্যবস্থা চালু করবে প্রতিষ্ঠানটি।
মেটার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, তাদের প্ল্যাটফর্মের নকশা শিশু ও কিশোরদের অতিরিক্ত ব্যবহারে উৎসাহিত করে এবং এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা মামলাগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে এরই মধ্যে মেটাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
নতুন সমঝোতার আওতায় ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে একাধিক পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের একটি হলো দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা। শিশু ও কিশোররা প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত থাকবে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বর জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়: ববি হাজ্জাজ
সামাজিক তুলনা কমানোর লক্ষ্যেও কিছু পরিবর্তন আনা হবে। শিশুদের অ্যাকাউন্টে লাইক ও রিঅ্যাকশনের সংখ্যা গোপন রাখা হবে। ব্যবহারকারীর চেহারায় পরিবর্তন আনে এমন প্রসাধনী ফিল্টারও ডিফল্টভাবে বন্ধ রাখা হবে। এসব সেটিং পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
স্কুল চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি মনোযোগ কমাতেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কিশোর ব্যবহারকারীদের কাছে পাঠানো অধিকাংশ পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখবে মেটা।
অভিভাবকদের জন্যও বাড়তি নজরদারির সুযোগ রাখা হচ্ছে। নির্ধারিত অভিভাবক বা অভিভাবকসুলভ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সন্তানের অ্যাকাউন্টের বিভিন্ন সেটিং আরও বিস্তৃতভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরিবর্তন করতে পারবেন।
সন্তানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা সময় কাটছে, কোন ব্যবহারকারীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে এবং কারা তাদের বার্তা পাঠাচ্ছে, এসব তথ্যও অভিভাবকরা দেখতে পারবেন। কোনো কিশোর প্রথমবার কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অ্যাকাউন্টে বার্তা পাঠালে তার অভিভাবককে দৈনিক নোটিফিকেশন দেওয়া হবে এবং ওই অ্যাকাউন্টের লিংকও পাঠানো হবে।
আরও পড়ুন: বিএনপির শোভাযাত্রা উপলক্ষে নয়াপল্টনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি বা খাবারজনিত মানসিক সমস্যাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট শব্দ খোঁজা হলেও অভিভাবকদের জানাবে মেটা।
শিশুদের বয়স যাচাই ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজেদের প্রযুক্তির পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং বয়স যাচাই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিতভাবে বাইরের সংস্থার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে।
মেটা অবশ্য কোনো অন্যায় স্বীকার করেনি। তবে সমঝোতার আওতায় প্রতিষ্ঠানটি আগামী ১০ বছরে বিভিন্ন মার্কিন অঙ্গরাজ্য ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং নিউইয়র্ক ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার পেতে পারে। টেক্সাস আলাদাভাবে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সমঝোতায় পৌঁছেছে।
মেটার মোট সমঝোতার অঙ্ক ১৮ বিলিয়ন ডলার বলা হলেও, এর পুরো অর্থ প্রতিষ্ঠানটিকে তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে না। মোট অর্থের প্রায় ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৭০ শতাংশ আগামী ১০ বছরে পরিশোধ করবে তারা। বাকি প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে তখনই, যখন স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে অর্থ দিতে সম্মত হবে।
আরও পড়ুন: ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সিপাহী-জনতার প্রতিরোধই আসল বিপ্লব: রাশেদ খান
এই পরিবর্তনগুলো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। আদালত সমঝোতাটি অনুমোদন করার পর চার মাসের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয় এমন ফিড চালুর কথা রয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে আরও বিস্তৃত নিয়ম কার্যকর হবে এবং এক বছরের মধ্যে বয়স যাচাইসংক্রান্ত বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে নতুন নিয়মগুলো আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। বিশ্বের অন্য দেশেও একই পরিবর্তন আনা হবে কি না, সে বিষয়ে মেটা এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মেটার বিরুদ্ধে শিশু সুরক্ষা ও আসক্তিকর নকশা নিয়ে নিয়মিত তদন্ত করছে। যুক্তরাজ্য আগামী বছর ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। ব্রাজিলেও শিশুদের অ্যাকাউন্টে অভিভাবকের সংযুক্তি বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে শিশু নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু দৈনিক ব্যবহারের সময় কমিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের মতে, অনন্ত স্ক্রল, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বার্তা, উপহার পাঠানো, লাইভস্ট্রিমিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ফিচারগুলোর অনেকগুলোই এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসেনি।
আরও পড়ুন: সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-আহতরা পাবেন ১-৫ লাখ টাকা, আবেদন যেভাবে করবেন
ফলে মেটার এই সমঝোতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষায় বড় পরিবর্তনের সূচনা করলেও, অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না।
সূত্র: আল জাজিরা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন