০৭:২৬ এম
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আস্থা নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রতি রয়েছে।
প্রায় দুই বছরের বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের অচলাবস্থা কাটিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার।
যার ফল ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ১৭ ফেব্রুয়ারির সরকার গঠনের পর উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য পৃথক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে সরকার। এর অংশ হিসেবে এডিবি বাজেট সহায়তা দিয়েছে এক বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ সরকারকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি ঋণচুক্তির জন্য প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক দেড় বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা দিচ্ছে এ মাসেই। যার একটি বড় অংশ দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারে কাজে লাগানো হবে। এদিকে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সুখবর দেওয়া হয়েছে।
দুবাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ছিল, সেটাও অনেকটা কেটে গেছে। জাইকা, ইএসএইড, ইউএনডিপি, আইডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীরা নতুন করে ঋণ ও সহায়তার হাত বাড়াচ্ছেন। এবার ২০২৬-২৭ বাজেটে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। যা চলতি বাজেটের চেয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় কাজে মালয়েশিয়া ও চীন সফল করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি দেশের কূটনৈতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতন ঘটে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণে ভেঙে পড়ে আর্থিক কাঠামো। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে অভিষিক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এটি টেনে তোলার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক ও সামগ্রিক আর্থিক খাতের সংস্কারের উপর মনোযোগী হয় সরকার। এর ফলে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করে তিন মাসের ব্যবধানেই।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রত্যেক সরকারেরই আলাদা পরিকল্পনা থাকে। তবে বর্তমান সরকার অতি অল্প সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। এতে সরকার অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, যা দেশকে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স এর ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ও রাজস্ব ঘাটতির সময়ে এ ধরনের সহায়তা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থের চেয়ে বড় বিষয় হলো সংস্কার বাস্তবায়ন। ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা কার্যকর সংস্কার এনে দেশ সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে চাই। দেশের জাতীয় স্বার্থ অটুট রেখে ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে তাদের দেশের উন্নয়নে আমরা কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। এতে তরুণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব রয়েছে।
আইএমএফ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তির আলোচনা শুরু করেছে। ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নির্বাচিত সরকার ছাড়া চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তির বাকি দুই কিস্তির অর্থ ছাড় করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিল আইএমএফ। ১২ ফেব্রুয়ারির পর সংস্থাটি তাদের মনোভাব পরিবর্তন করেছে। ওই পুরোনো ঋণের অবশিষ্ট কিস্তির সঙ্গে নতুন করে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তির প্রস্তাব দেয় নির্বাচিত সরকারকে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
জানা গেছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক খাতের চাপ মোকাবিলা এবং বাজেট সহায়তা জোরদারের লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ পেতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরে নতুন ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। এদিকে, নতুন ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল আগামী ১২ থেকে ১৭ জুলাই ঢাকা সফর করবে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা) বাজেট সহায়তা দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB)। এই অর্থ প্রবাহের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে উঠেছে। সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। গড়ে মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হিসেবে ধরলে, বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। যা আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ মানদণ্ড (কমপক্ষে তিন মাস) ছাড়িয়ে গেছে।
অতীতে রিজার্ভ চাপের মুখে পড়ে ব্যবহারযোগ্য অংশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচেও নেমে গিয়েছিল। সেই সময় বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
চলতি মাসেই তিনটি ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাজেট সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ১.৫ বিলিয়ন (১৫০ কোটি) ডলার অনুমোদন করতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে চাপে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে আসবে। এই তহবিলের মধ্যে, র্যাপিড রেসপন্স অপশন (আরআরও) উইন্ডোর আওতায় চলমান প্রকল্প ঋণ থেকে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার পুনর্নির্ধারণ (রিপারপাস) করা হবে। সার আমদানি ও খাদ্য সহায়তার জন্য দেওয়া হবে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ থাকবে ৪০০ মিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন ডিসি এবং ঢাকা উভয় স্থানেই কয়েক দফা আলোচনার পর এই বড় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
চীনের অর্থায়নে দেশের অবকাঠামো খাতে নতুন করে বড় বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশে আরও একটি পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণসহ সড়ক, রেল ও সেতু খাতের ২০টির মতো প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এগুলো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এতে ইতিবাচক খবর পাবে বাংলাদেশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র জানায়, চীনের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি ৯টি প্রকল্পের নাম জমা দিয়েছে সেতু বিভাগ। এর মধ্যে আছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও গাইবান্ধার বালাসীঘাটের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এটি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পথ (অ্যালাইনমেন্ট) নিয়ে সমীক্ষা চলছে। এগুলো হলো বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলা-জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে যমুনা নদীর ওপর।
অন্যটি গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত। এর বাইরে অন্য যেকোনো উপযুক্ত স্থানে।
এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামে উড়াল মহাসড়ক, ঢাকার জন্য সাবওয়ে ও নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ আসতে পারে। এক সমীক্ষায় রাজধানীর ১১টি রুটে ২৩৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে চারটি পথ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন