০৫:৫০ পি.এম
রৌদ্রোজ্জ্বল এক সোমবার। ৫৫ বছরের ফালানি বেগম বয়স এবং ক্লান্তির ভারে কুঁকড়ে গেছেন।
চোখের পাতাগুলো ভারী, গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের ভুল নাম সংশোধনের জন্য উপজেলা সদরে যাওয়ার মতো শারীরিক শক্তি অথবা আর্থিক সামর্থ্য—কোনোটাই তার নেই। তবে উপজেলা সদরে যাওয়া মানেই বাড়তি সময় আর দ্বিগুণ ভাড়ার দুশ্চিন্তা। তখনই রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের বেলদী ফাজিল মাদরাসা মাঠে হাজির হলো উপজেলা প্রশাসনের ওয়ানস্টপ সার্ভিস প্রকল্প ‘বিনা মূল্যে সবার জন্য সব সেবা’।
আরও পড়ুন: বাংলা একাডেমির ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ সংস্কারে নতুন রূপ
যেন জাদুকরী কোনো ছোঁয়ায় ঘরের দরজায় চলে এলো কাঙ্ক্ষিত সেবা। ফালানি বেগমের মতো হাজারো মানুষের চোখে তখন বিস্ময় এবং আনন্দাশ্রু।
একদিনের জন্য দাউদপুর ইউনিয়ন হয়ে ওঠে একটি ভ্রাম্যমাণ মিনি উপজেলা। স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নির্বাচন অফিস, সমাজসেবা, ভূমি এবং সমবায় অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তরের আলাদা বুথ সেখানে বসেছিল।
দীর্ঘদিনের জমে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতা থেকে শুরু করে গবাদিপশুর চিকিৎসা কিংবা কৃষি পরামর্শ— সব সেবা মানুষ পেয়েছে এক ছাদের নিচে। প্রায় ৯ হাজার মানুষ এই অভিনব উদ্যোগ থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন, যা স্থানীয় লোকজনের মতে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য নজির।
উপজেলা প্রশাসনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশিকুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসন গত বছর প্রজেক্ট ওয়ান থাউজেন্ট প্রকল্প চালু করেন। এই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার এক হাজার তরুণ-তরুণীদের সামলম্বী করার লক্ষ্যে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ এবং নগদ অর্থ প্রদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার দাউদপুর ইউনিয়নের মানুষকে নাগরিক সেবা দিতে নেওয়া হয় অভিনব এই উদ্যোগ।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষককে মারধর, শিশুর বাবার বিচার দাবি
এতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ দপ্তরগুলো থেকে সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
কথা হয় বেলদি থেকে সেবা নিতে আসা আশরাফুজ্জান ফরিদের সঙ্গে। তিনি এসেছেন গরুর চিকিৎসা নিতে। তিনি বলেন, বাজান বয়সতো আর কম অইলো না। এতোখানি বয়সে এমুন সুন্দর নিয়ম দেহি নাই। আমাগো দাউদপুর থেইক্যা প্রাণী অফিসো যাইতো দেড় ঘণ্টা লাগবো। আবার ভাড়া লাগে অনেক। বাড়ির কাছে এমুন সুযোগ পাইয়া উপকার অইছে। বেলদীর রাশিদা বেগম। অনেক দিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের জটিলতায় ভুগছেন। উপজেলা নির্বাচন অফিস অনেক দূরে হওয়ায় যাওয়া হয়নি আর। তিনি বলেন, আজকা বাড়ির কাছে সুযোগ পাইয়া ভালাই লাগতাছে। কৃষি বিষয়ে দেবই থেকে পরামর্শ নিতে এসেছেন ষাটোর্ধ সফেদ আলী। তার ভাষায়, বাজান জীবনে অনেক কিছু দেখছি। তয় এতো সুন্দর কইরা উপজেলা প্রশাসন সেবা দিয়া গেলো এলাকায় আইয়া। এইডা জীবনে দেহি নাই।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাসভীর যোবায়ের বলেন, আমার চাকরির ইতিহাসে এমনটা কোথাও দেখিনি। মানুষ উপজেলা অথবা হাসপাতালে সেবা নিতে আসে। কিন্তু এখানে উপজেলার সব দপ্তর, হাসপাতাল এলাকায় যেয়ে মানুষের সেবা দিয়েছে। এ সময় রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান হুমায়ুন, সাধারণ সম্পাদক বাশিরউদ্দিন বাচ্চুসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং নেপথ্য নায়ক উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয়। রিমোট এলাকার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে তিনি এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। গ্রামবাংলার মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার এমন দৃশ্য সত্যিই সবার মন ছুঁয়ে যায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার এই অভিনব উদ্যোগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
আরও পড়ুন: খাগড়াছড়িতে অবরোধ চলছে, দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ
স্বপ্নদ্রষ্টা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, দাউদপুর ইউনিয়ন একটি রিমোট এরিয়া। এখান থেকে উপজেলায় কিংবা হাসপাতালে এসে সেবা নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। অনেকে শারীরিক অক্ষমতা কারণে আসতে পারে না। অনেকে হয়তো দ্বিগুণ অর্থ খরচ লাগে তাই আসতে পারে না। এ চিন্তা মাথায় নিয়ে সব দপ্তরের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ভূমি অফিসের জন্য আলাদা আলাদা বুথ করা হয়েছে। যাতে যার যে সমস্যা সে যেনো ওই সেবা নিতে পারেন। তবে ধীরে ধীরে সব ইউনিয়ন এবং পৌরসভায় চলমান থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন