০১:২৯ এম
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মিত্র হয়ে ওঠার উদাহরণ বিদ্যমান। ২০০৭ সালে নওয়াজ শরীফ এবং বেনজির ভুট্টোর মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসি’ এর মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের সমাপ্তি ঘটে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে কি নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান আবারও কোনো সমঝোতায় আসতে পারেন?
সোহেল ওয়ারাইচের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে জোট গঠনের সম্ভাবনা নেই। তবে পি জে মীরের ধারণা, কোনো না কোনোভাবে তাদের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে এবং তারা এবার একসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন।
আরও পড়ুন: রাহুল গান্ধীর পদযাত্রা: ভারতের গণবিক্ষোভে যুবদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত
নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানের সম্পর্কের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও নাটকীয় অধ্যায়, যেখানে বন্ধুত্ব থেকে রাজনৈতিক জোট, তারপর বিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত তীব্র বৈরিতা দেখা গেছে। তাদের সম্পর্কের পরিবর্তন পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতি, সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
১৯৯২ সালে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ জয়ের পর ইসলামাবাদে নওয়াজ শরীফের বাসভবনে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাদের সম্পর্কের একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। ওই অনুষ্ঠানে এক বিদেশি সাংবাদিক নওয়াজ শরীফকে ইমরান খান সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তখন নওয়াজ জানান, তিনি আগেই ইমরান খানকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
নওয়াজ শরীফ তখন ৪৩ বছর বয়সী এবং ইমরান খান ৪০ বছর বয়সী ছিলেন। দুজনেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার শীর্ষে ছিলেন। কেউই হয়তো ভাবেননি, ভবিষ্যতে তারা পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় দুই চরিত্রে পরিণত হবেন এবং একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক লড়াইয়ে জড়াবেন।
ক্রিকেট থেকেই পরিচয়
আরও পড়ুন: দুর্গোৎসবের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে শুভেন্দুর চরম অব্যবস্থাপনা নগ্ন হয়ে পড়ল
নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান দুজনেই লাহোরের সচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠেন। নওয়াজ ছিলেন ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান, অন্যদিকে ইমরানের বাবা ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেরই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল।
ইমরান খান ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের টেস্ট দলে জায়গা পান। নওয়াজ শরীফের ক্রিকেট ক্যারিয়ার সীমিত হলেও তিনি ক্লাব ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত ইত্তেফাক ক্রিকেট ক্লাবে সে সময়ের অনেক নামী ক্রিকেটার খেলতেন।
লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবেই ইমরান ও নওয়াজের পরিচয় ঘটে। ইমরান তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিলেন, আর নওয়াজ তখন রাজনীতিতে প্রবেশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিলেন।
সাবেক ক্রিকেটার ও সাংবাদিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের সম্পর্ক শুরুতে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল না। ইমরানের বাউন্সারে নওয়াজকে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হতো। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: নাইজেরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৮ সেনা নিহত
রাজনীতিতে নওয়াজ, ক্রিকেটে ইমরান
১৯৮২ সালে ইমরান পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হন। এর আগে ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হওয়া নওয়াজ শরীফ ১৯৮৫ সালে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী হন। দুজনেরই তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।
নওয়াজের ক্রিকেটপ্রেম তখনও অটুট ছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি নিয়মিত জিমখানায় ক্রিকেট খেলতেন। এমনকি আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটও খেলেছিলেন।
১৯৮৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে নওয়াজ শরীফের ক্রিকেটপ্রেম নিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ইমরান খানকে না জানিয়ে নওয়াজকে ওই ম্যাচে পাকিস্তান দলের অধিনায়ক করা হয়। পরে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে টস করতে মাঠে নামেন এবং ব্যাটিংয়ের জন্য প্রস্তুত হন।
আরও পড়ুন: আঞ্চলিক সংকট সমাধানে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের আলোচনা
শেষ পর্যন্ত নওয়াজ শরীফ দুই বলের বেশি টিকতে পারেননি এবং দ্বিতীয় বলেই তিনি বোল্ড হয়ে যান।
ইমরানের সাফল্যে নওয়াজের ভূমিকা
১৯৮৮ সালে নওয়াজ আবার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ১৯৯০ সালে প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। একই সময়ে ইমরান খানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারও সাফল্যের শীর্ষে ওঠে।
১৯৯২ বিশ্বকাপের আগে ইমরানের দল থেকে জাভেদ মিয়াঁদাদ বাদ পড়ার ঘটনায় নওয়াজ শরীফের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছেন জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক কামার আহমেদ। তবে মিয়াঁদাদ নিজে এ বিষয়ে নওয়াজের ভূমিকা নিশ্চিত করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ‘কিন সোর্ড ২৭’ নতুন নজির গড়তে যাচ্ছে
তবে ইমরান খানের আরেকটি বড় প্রকল্প শওকত খানম হাসপাতাল নির্মাণে নওয়াজ শরীফের সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ১৯৯২ বিশ্বকাপের আগেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ হাসপাতালের জন্য জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইমরানকে সহায়তা করেন। পরে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে নওয়াজ উপস্থিত ছিলেন।
রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব
১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর নওয়াজ শরীফ প্রকাশ্যে জানান যে তিনি ইমরান খানকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ইমরান তখন জানান, তাকে এর আগে দুবার রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখতে পাচ্ছিলেন না।
তবে মাত্র চার বছর পর, ১৯৯৬ সালে ইমরান খান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
আরও পড়ুন: ভূমধ্যসাগরের উষ্ণতায় কচ্ছপের বংশবিস্তার ঝুঁকিতে, পুরুষ কচ্ছপের অভাবের শঙ্কা
রাজনীতিতে আসার আগে নওয়াজ শরীফ আবারও ইমরানকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ইমরানের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, নওয়াজ তাকে প্রথমে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ এবং পরে জাতীয় পরিষদের ২০টি আসন নিয়ে জোট করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে পি জে মীরের দাবি।
ইমরান অবশ্য সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করতেন।
সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আবার একসঙ্গে
১৯৯৭ সালের নির্বাচনে ইমরান খান ও তার দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন।
কিন্তু ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর জেনারেল পারভেজ মুশাররফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজ সরকারের পতন ঘটান। নওয়াজ কারাবন্দি হওয়ার পর সৌদি আরবে নির্বাসিত হন। অন্যদিকে, প্রথমে মুশাররফকে সমর্থন করলেও পরবর্তী সময়ে ইমরানও তার কাছ থেকে দূরে সরে যান।
২০০৭ সালে মুশাররফের আমলে ইমরান কারাবন্দি হন। এরপর লন্ডনে নওয়াজের সঙ্গে ইমরানের সাক্ষাৎ ঘটে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তারা আবারও একজোট হন।
২০০৭ সালের জুনে তারা পারভেজ মুশাররফের শাসনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দেন এবং অল পার্টিজ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যুক্ত হন।
কিন্তু সেই জোটও বেশিদিন টেকেনি। নির্বাচন বর্জন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আবারও তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।
বন্ধুত্ব থেকে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই
২০১১ সালে ইমরান খান নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে আসেন। তখনও তার প্রধান রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। নওয়াজ শরীফের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি বৈরী হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচন সামনে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের লড়াই মূলত একে অপরকে ঘিরেই। এরপর তাদের রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থান ক্রমেই কঠোর হয়ে ওঠে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরীফ দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। একই নির্বাচনে ইমরান খান প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। যে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে একসময় নওয়াজ তাকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাসভবনের বাসিন্দাই হন ইমরান।
কিন্তু ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্বও পূর্ণ মেয়াদ পায়নি। তিনি তার ক্ষমতাচ্যুতির জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পাশাপাশি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকেও দায়ী করেন। নওয়াজ শরীফও এর আগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন