০৮:০৩ পি.এম
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ সপ্তাহ পর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যা পুরোপুরি যুদ্ধও নয়, আবার শান্তিও নয়।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও, মার্কিন বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনারা নিয়মিত উত্তেজনার মাঝে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এমনকি কিছু সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তারা তাদের দায়িত্বে ফিরে আসছেন।
আরও পড়ুন: ১২৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে
একই সঙ্গে, পেন্টাগন ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মজুত পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত মোতায়েনের কারণে সেনাসদস্যদের পরিবারও মানসিক চাপে ভুগছে।
শুক্রবার ইরান বাহরাইন ও কুয়েতের উদ্দেশ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। যদিও ট্রাম্প এপ্রিল মাসে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবুও সংঘাত কার্যত অচলাবস্থায় রয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে ইরান এখনও সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে ট্রাম্প আবার বড় ধরনের বিমান হামলার হুমকি দিয়েছেন।
এই সমস্ত পরিস্থিতির মধ্যে মার্কিন বাহিনীকে সর্বদা যুদ্ধ প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে বলা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সরকারকে সেলিম উদ্দিনের আহ্বান, গণরায়ের বিরুদ্ধে না গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়ান
ঘাঁটিগুলোতে অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। একইসঙ্গে, ড্রোন ও স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সব সময় ‘লেভেল-১০’ সতর্কতায় থাকা এবং মুহূর্তের নোটিশে অভিযানে প্রস্তুত থাকা এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত চাপের ও কঠিন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক প্রধান জোসেফ ভোটেল বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘খুবই বিপজ্জনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সেনাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যুদ্ধের কারণে আহত সেনাদের নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। মার্কিন আর্মি রিজার্ভের সার্জেন্ট কোরি হিকস ইরানি ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে আছেন। হামলায় তার শরীরে শার্পনেল ঢুকে একটি ধমনি ছিঁড়ে যায় এবং চোয়াল ভেঙে যায়। পাশাপাশি তিনি মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পান।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
৩৭ বছর বয়সী এই আর্মি বলেন, ‘ড্রোনটি দ্রুতগতিতে আসা ছোট বিমানের মতো শব্দ করছিল। এরপর সেটি ভবনে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। আমি শুধু আগুনের বড় গোলা, প্রচণ্ড চাপ ও তাপ অনুভব করেছিলাম, তারপর আর কিছু মনে নেই।’
মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রায় ৪০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই মস্তিষ্কে আঘাত পেয়েছেন। আহতদের ৯০ শতাংশেরও বেশি ইতোমধ্যে তাদের দায়িত্বে ফিরে গেছেন। সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
দীর্ঘায়িত সংঘাত সেনাসদস্যদের পরিবারের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ইয়াদিরা দেসাঁর ছেলে মার্কিন আর্মি রিজার্ভে কর্মরত। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির মাঝেও কি হচ্ছে তা জানি না।’ ফলে স্বজনদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণার অভাবে পরিবারগুলো উদ্বেগে থাকে।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ছেলেকে একটি বার্তা পাঠাই—সুপ্রভাত, বাবা। আমি তোমাকে ভালোবাসি। মাঝে মাঝে সে উত্তর দেয়, আমিও তোমাকে ভালোবাসি মা অথবা তোমাকে মিস করছি।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহ: জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধ সাম্রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের নয়
দেসাঁ দাবি করেন যে, তার ছেলে কয়েকবার ইরানি ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ তার আশপাশে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদি চাপের আশঙ্কা রয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চললেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেকোনো সম্ভাব্য সমঝোতা কেবল যুদ্ধবিরতির সময়সীমা দীর্ঘায়িত করবে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এদিকে, দীর্ঘ সংঘাতের কারণে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ টম কারাকো এর মাধ্যমে জানান, ‘যুদ্ধ শুধু অস্ত্রভাণ্ডারকেই ক্ষয় করে না। এটি মানুষ ও সামরিক সরঞ্জামের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে।’
আরও পড়ুন: পুতিন ও জেলেনস্কির শিগগিরই বৈঠক হবে: ট্রাম্প
গুরুতর আহত হওয়ার স্মৃতি কোরি হিকসকে তাড়া করে ফেরে। কুয়েতে হামলার যে ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে তার ৬ সহযোদ্ধা নিহত হন। তাদের একজন ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল আমর।
হিকস বলেন, ‘ড্রোনটি আঘাত হানার মুহূর্তে আমি সার্জেন্ট আমরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি আমার থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে ছিলেন। এই স্মৃতি আমাকে সারা জীবন বহন করতে হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন