০৮:১৮ পি.এম
রাজধানীর অন্যতম কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্ররাজনীতির চিত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম, শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও ক্যাম্পাসে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পর কয়েকটি সংগঠনের কার্যক্রম আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সময়ে একসময় নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি পালনকারী কিছু সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রমও তুলনামূলকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য সাংগঠনিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কার্যক্রমে গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সম্প্রতি নতুন কমিটি ঘোষণার পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা পলিটেকনিক শাখা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি পরিচালনা করছে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়, স্মারকলিপি প্রদান, সাংগঠনিক সভা, সামাজিক কার্যক্রম এবং সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে বিবৃতি দেওয়ার মাধ্যমে সংগঠন দুটি ক্যাম্পাসে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
এদিকে, গত ১লা আগস্ট আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণসভা ও সৃজনশীল শিক্ষার্থী সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতৃবৃন্দ, কর্মী সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও, ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কোনো নেতৃবৃন্দকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির সভাপতিও বক্তব্য দেন। তবে ছাত্রশিবিরের সভাপতির নাম ঘোষণা করা হলে, অনুষ্ঠানে তাকে উপস্থিত পাওয়া যায়নি।
ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির সক্রিয় উপস্থিতির বিপরীতে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের দৃশ্যমান অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম এমন চিত্রই ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক সাংগঠনিক কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা পলিটেকনিক শাখার প্রকাশ্য কার্যক্রমে দৃশ্যমানভাবে ভাটা পড়েছে। গত বছর সংগঠনটির উদ্যোগে ক্যাম্পাসে নবীনবরণ অনুষ্ঠান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বিনামূল্যে কোরআন বিতরণ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইফতার মাহফিল, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সহায়তায় হেল্প ডেস্ক, বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, ফুটবল টুর্নামেন্ট, মধ্যাহ্নভোজ ও ফ্রি কোরআন শিক্ষা কর্মসূচিসহ ১৫টিরও বেশি বড় পরিসরের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এসব কর্মসূচিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যভাবে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ‘জুলাই রচনা প্রতিযোগিতা’ ছাড়া গত বছরের মতো বড় পরিসরের আর কোনো শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি চোখে পড়েনি। ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর সংগঠনটির প্রকাশ্য সাংগঠনিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কার্যক্রমের পরিমাণ কমেছে বলে ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক কার্যক্রম পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
শুধু ছাত্রশিবির নয়, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাকা পলিটেকনিক শাখারও প্রকাশ্য কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির বড় কোনো ক্যাম্পাসভিত্তিক অনুষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ক্যাম্পাসে বর্তমানে ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির দৃশ্যমান উপস্থিতি অন্য সংগঠনগুলোর তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা পলিটেকনিক শাখার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সংগঠনটির অনেক প্রশিক্ষণমূলক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম অভ্যন্তরীণভাবে পরিচালিত হয়, যেগুলো সবসময় প্রকাশ্যে প্রচার করা হয় না। তাদের দাবি, বর্তমানে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। চলমান পর্ব সমাপনী পরীক্ষা শেষ হলে পর্যায়ক্রমে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তারা।
এদিকে, গত ১ আগস্ট আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণসভা ও সৃজনশীল শিক্ষার্থী সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে তাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ জানান, স্মরণসভা অনুষ্ঠানে স্থানীয় ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলনকে অতিথি হিসেবে রাখা হয়নি। এ কারণে তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অনুষ্ঠানকে দলীয় অনুষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে এমন অভিযোগও তারা করেন।
ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে সব সংগঠনের কাছ থেকেই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন। তাদের মতে, যে সংগঠন শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করবে, দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তুলবে এবং নিয়মিত ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই সংগঠনের প্রতি আস্থা রাখবে।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্ররাজনীতিতে দৃশ্যমান উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততা একটি সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক নীতিমালা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও একটি সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অন্যতম ভিত্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো ছাত্রসংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সেগুলো হচ্ছে:
১. সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা অভ্যন্তরীণ পুনর্বিন্যাস
২. নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়া
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
৩. কৌশলগত কারণে সীমিত প্রকাশ্য কার্যক্রম
৪. প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক বাস্তবতা
৫. ক্যাম্পাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির প্রকাশ্য তৎপরতা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে, ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রকাশ্য সাংগঠনিক উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। তবে ছাত্রশিবিরের দাবি, এটি কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার চিত্র নয়; বরং অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ফল। পর্ব সমাপনী পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন