১২:৪৬ পি.এম
সিলেটে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় আটক আসামি বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরাটি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে রায়নগরের একটি খালি প্লটে তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
বুধবার সকালে নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এ সময় বাসার ভেতরে ঢুকে স্বামী, স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়।
আরও পড়ুন: নড়াইলে ‘ড. রাফি-বেগম মেমোরিয়াল জুনিয়র গলফ টুর্নামেন্টের পুরস্কার ও চারা বিতরণ
নিহতরা হলেন ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা আক্তার (২০)। উল্লেখ্য, তাহমিনা নগরীর জল্লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফতাব মিয়ার মেয়ে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং আলামত উদ্ধারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, উদ্ধার করা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। এতে থাকা রক্তের নমুনার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এই মাধ্যমে ছোরায় থাকা রক্তের উৎস নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া প্রকাশ করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি রায়নগরের একটি খালি স্থানে ছোরাটি ফেলে দেন। বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চললেও ছোরার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: খুলনায় ৯৬৬টি মণ্ডপে বৈচিত্র্যময় থিম ও দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা
তবে, বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিকদের নিয়ে ফের তল্লাশি চালালে ছোরাটি উদ্ধার করে পুলিশ। বাবুল মিয়া যে ধরনের ছোরার কথা বলেছিলেন, উদ্ধার হওয়া ছোরাটি তার সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে বলে জানান উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাবুল মিয়া রঙমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করেন। আটকের পর তিনি পুলিশকে জানান, ছোরাটি ছয় থেকে সাত ইঞ্চি লম্বা ও কাঠের হাতলযুক্ত ছিল।’
উদ্ধার হওয়া ছোরাটির বর্ণনা বাবুল মিয়ার দেওয়া বিবরণের সঙ্গে যথেষ্ট মিল রয়েছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধোয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, আলামত বিশ্লেষণ করে তথ্য পাওয়া গেছে। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং ছোরার ধাতব অংশেরও শুকনো রক্তের দাগ দেখা গেছে।
একটি ব্যাগে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া বলেছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের সম্পর্ক প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কিনা, সেটি জানাননি বাবুল। তবে গৃহকর্মীর কোনো আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, এবং সেই ক্ষোভ থেকেই তাকে হত্যা করতে শিশির নিয়ে বাসায় গিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: গাজীপুরবাসীর ১৪ বছরের অপেক্ষা, দ্রুত বিআরটি চালুর দাবি
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে বাবুল বলেন, প্রথমে গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। যখন গৃহকর্ত্রী রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তিনি বাধা দেন, পরে গৃহকর্তা এগিয়ে আসলে তাকেও ছুরিকাঘাত করেন। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বাবুল মিয়া।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ বাসায় প্রবেশের সময় দেখেছে, দরজার নিচের ছোট ছিটকানি ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। বাবুল মিয়া যে বারান্দা দিয়ে পালানোর কথা বলছেন, সেখান থেকে রেলের হাতের ছাপ ও পায়ের ছাপ মেলে। বিশদভাবে নিচেও রক্তের চিহ্ন মেলে। তবে, বাবুল মিয়া ছাড়া অন্য কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করেছেন কিনা, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, হত্যাকাণ্ডের পরে বাসার কয়েকটি ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে সেগুলি ভাঙা ছিল না। সেখান থেকে কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কিনা, তা জানাতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানাচ্ছে, উদ্ধার হওয়া দলিলসদৃশ কাগজটি মূল দলিল নয়, সম্ভবত একটি ফটোকপি বা অনুলিপি। এটির সঙ্গে কোনো মামলা কিংবা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা তদন্ত চলছে।
আরও পড়ুন: বনপাড়া শহর প্রেসক্লাবের নবগঠিত কমিটি গঠন: সভাপতি হযরত আলী,সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম
পুলিশ আরও জানায়, বাবুল মিয়া আগে ওই বাসায় রং করার কাজ করেছেন। এর ফলে বাসা এবং ঘরের ভেতরের পরিবেশ ও বিভিন্ন জিনিসপত্র সম্পর্কে তার ধারনা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বাসাভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বাসাভাড়া পরিশোধ করেছেন কিনা এবং ঘটনার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, এটি নিয়েও তদন্ত চলছে।
উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মামলার বিষয়ে জানান, নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানরা দেশে এসে অভিভাবক ও আইনজীবীদের মাধ্যমে এজাহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজাহার পাওয়া গেলে সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে এবং আটক বাবুলকে আদালতে হাজির করা হবে।
জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ওই এলাকায় লোডশেডিং চলাকালে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহতদের বাসা ও পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। এছাড়া নিহতদের বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে কাউকে দেখা যায়নি। তবে যে গলির মাধ্যমে হত্যাকারী পালিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানের সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরবর্তীতে সেদিন রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে খুনিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তখন বাসার সিসিটিভির ফুটেজের তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ এতে খুনি পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বাসার বিভিন্ন কক্ষে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এর মধ্যে একজনের সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো হয়ে গিয়েছিল। তবে বাকি দুটির ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। সেই ফুটেজের সূত্র ধরেই ৬ ঘণ্টার মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণপাড়ায় সাপের কামড়ে ১৪ বছরের স্কুলছাত্রীর মৃত্যু
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার দম্পতি মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও তিনি আওয়ামী লীগের একজন পুরনো কর্মী হিসেবে মহল্লায় পরিচিত ছিলেন। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তাদের এক ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে, যারা উভয়েই সপরিবারে লন্ডনে বাস করছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন