০৫:০৩ পি.এম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ রয়েছে। ধর্ষণচেষ্টা, নারী হেনস্থাসহ বিভিন্ন ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের দাবি উঠছে। একাধিক আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন এবং ছাত্রীদের রাতের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপের কারণে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এক্সটেনশন এলাকার রাস্তার পাশে এবং পুরনো সুইমিংপুল এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রশাসন তাদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংকুচিত করছে।
সম্প্রতি, ছাত্রীদের হল থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণের ফলে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীন চলাচল নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাহানারা ইমাম হলে একটি নোটিশে রাত ১১টার পর ছাত্রীদের হল থেকে বের হওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পর বের হতে হলে কারণ উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোটিশটি ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুনে নিহতের ঘটনায় জামায়াতের শোক
প্রীতিলতা হলেও দীর্ঘদিন ধরে রাত ১০টার পর ছাত্রীদের হল থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে চলাচলের সময় নির্ধারণের মাধ্যমে নিরাপত্তার দায় নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিসা জামান বলছেন, ‘রাত ১১টার পর মেয়েদের হলের প্রবেশ-বের হওয়ার ক্ষেত্রে খাতায় নাম লেখার ব্যবস্থা মেয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সান্ধ্য আইন চাপিয়ে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে মেয়েদের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করা কোনো সমাধান নয়।’
প্রীতিলতা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সানজিদা খানম মন্তব্য করছেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরে যেখানে আবাসিক শিক্ষার্থীদের রাতের ক্যাম্পাসজীবন গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে চলাফেরার সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে—এটি কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঠিক পদ্ধতি?’
নারী নিরাপত্তা মঞ্চসহ একাধিক সংগঠন হল প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সউদী আরব ও কাতারের সহায়তা চায় বাংলাদেশ
জাহানারা ইমাম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রাত ১১টার পর জরুরি প্রয়োজনে কোনো ছাত্রী যেতে চাইলে বা ফিরে এলে তাকে বাধা দেওয়া হবে না। তবে কোথায় যাচ্ছে ও ফোন নম্বর খাতায় লিখে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে সমস্যা হলে হল প্রশাসন সাহায্য করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ছাত্রীরা যদি এই নিয়ম চায় না, তাহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা হবে। তাদের মতামত ও স্বাধীনতার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে।’
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধি, কার্যকর সিসিটিভি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। তাদের মতে, নিরাপত্তার নামে শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করা হলে তা নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে।
আরও পড়ুন: শ্রেণিকক্ষে অধ্যাপক ড. খালিদ হোসাইন জুয়েল, মঞ্চে সংগীতশিল্পী
জার্নালিজম ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রাসেল বলছেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা সমাধানের পথ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে তারা নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে।’
রাস্তার পাশে কাঁটাতারের বেড়া থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে তা মারাত্মক হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রক্টর অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন জানান, ‘একজন ছাত্রীকে বহিরাগত একজনের ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পরে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে নিরাপত্তার স্বার্থে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া হয়েছে, তাই এটি ব্যবহারবান্ধব কিনা সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। যদি শিক্ষার্থীরা মনে করে এতে সমস্যা হচ্ছে, তাহলে প্রশাসনকে জানালে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।’
রাত ১১টার পর ছাত্রীদের বাইরে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি মূলত হল প্রশাসনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। আগে একটি নিয়ম ছিল, তবে এখন এর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নই। যদি এটি বর্তমান না থাকে, তবে হল প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত অসঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে। সকল হল প্রশাসন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।’
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজার ছুটিতে সীমিত পরিসরে চলবে আমদানি-রপ্তানি
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন