০৯:৫৫ এম
১৯ জুলাই উত্তাল জুলাইয়ের এন দুটি ঘটনার মধ্যে একটি ছিল আন্দোলনের অন্যতম রক্তাক্ত অধ্যায়। সেদিন দেশে টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে অন্তত ৬৬ জন নিহত হন। সেদিন প্রথমবারের মতো আন্দোলনকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা শুরু হয়, যা ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান জানানো হলেও, শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রনেতারা বলেন, এই ৯ দফার মধ্যেই তৈরি হয়েছিল এক দফার ভিত্তি, যা সবার সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হয়।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ওইদিন ছিল কমপ্লিট শাটডাউনের দ্বিতীয় দিন। টানা তৃতীয় দিনের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। জুমার নামাজের পর থেকেই ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব না থাকলেও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে সারাদেশে অন্তত ৫৫ থেকে ৬৬ জন নিহত হন। ঢাকার সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ যাত্রাবাড়ীতে ঘটে, যা টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে চলে।
যাত্রাবাড়ীতে সেদিন আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। ভয়াবহ সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, জুমার নামাজ পরে মসজিদ থেকে মিছিল বের হওয়ার পরপরই গুলি চালানো হয়। এতে মুহূর্তেই ৫ থেকে ৭ জন নিহত হন এবং ফ্লাইওভারের ওপর থেকে মানুষের মাথা, হাত ও পা লক্ষ্য করে গুলি করা হচ্ছিল।
আরও পড়ুন: চার দিনের জাপান সফর শেষে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
সেদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। সেখান থেকে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে পল্টন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। পুলিশের গুলিতে ওইদিন ছাত্রদলের তিন নেতা-কর্মী নিহত হন।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, নয়াপল্টন ও পুরানা পল্টনে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। আমি নিজেও রাবার বুলেটে আহত হই, আর আমার তিন সহকর্মী শহীদ হন।
১৯ জুলাই আন্দোলন দমাতে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার থেকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। বসিলা ব্রিজের এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মোহাম্মদপুরের আবাসিক এলাকাতেও হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। এই অভিযান ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে।
সেই দিনের স্মৃতি তুলে ধরে মোহাম্মদপুর থানা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র ফেরদৌস হাসান সোহান বলেন, তিন রাস্তার মোড়ে ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল। আমার সামনে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েন। হেলিকপ্টার থেকে মাথায় গুলি করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর পেছাল
সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পর ১৯ জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন অভিভাবকরাও। এমন পরিস্থিতিতে সমন্বয়ক আব্দুল কাদের সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবির মধ্যে ছিল ছাত্র হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করে শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগ।
আব্দুল কাদের বলেন, আড়াই ঘণ্টার আলোচনা ও নানা মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে ৯ দফা চূড়ান্ত করা হয়। এটা কোনো একক ব্যক্তি বা সংগঠনের সিদ্ধান্ত ছিল না। ৯ দফার মধ্যে একটি দফার বীজ নিহিত ছিল।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতারা জানান, সবার সঙ্গে সমন্বয় করেই ৯ দফা ঘোষণা করা হয়েছিল। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ বলেন, ৯ দফা মূলত জনগণকে শেখ হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে আরও উজ্জীবিত করে। নিরাপত্তার কারণে আব্দুল কাদেরকে একাধিকবার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
এদিকে, ১৯ জুলাই মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে আটক করে পুলিশ। আন্দোলন দমাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি: জাপান
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সেই সময়ে ৯ দফা ছিল আন্দোলনের নতুন দিকনির্দেশনা। এর মধ্যেই এক দফার ভিত্তি তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যায়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন