১১:৪৯ এম
এক কাঁধে রাইফেল, অন্য হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী গ্রামের প্রবেশপথে পাহারায়। গ্রামটির ভেতরে সারি সারি মাটির তৈরি ছোট ছোট বাড়ি রয়েছে। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি লাগানো, ফলগাছ ro তৃণ ও নানা রঙের ফুল রয়েছে।
নতুন রঙে ভরা এই গ্রামটি সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মরুভূমির বুকে যেন এক স্বপ্নের জনপদ। কামিশলি শহরের বাইরে অবস্থিত এই গ্রামটিতে প্রায় ৩০টি বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং এর নাম জিনওয়ার। আঞ্চলিক কুর্দি ভাষায় এর অর্থ, ‘নারীদের পরিসর’ বলে পরিচিত।
যুদ্ধ, সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার নারীরা এখানে গ্রামটি গড়ে তুলেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এসেছেন যুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে, আবার কেউ এসেছেন নিরাপত্তা বা স্বাধীনতার খোঁজে। এখানে পুরুষদের স্থায়ীভাবে বসবাস বা রাত যাপন নিষিদ্ধ। পুরোপুরি নারী-পরিচালিত এই জনপদের জীবনযাত্রা সম্প্রতি ক্যামেরাবন্দী করেছেন ইতালীয় আলোকচিত্রী মাত্তেও ট্রেভিসান।
আরও পড়ুন: বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া গাড়ির চালককে উদ্ধার করলেন সাংবাদিক উইল মারে
দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জিনওয়ারের মতো নারী-নেতৃত্বাধীন স্বশাসিত কমিউনের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। কুর্দি, আরব এবং ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারীরা একত্র হয়ে নিজেদের স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষিভিত্তিক সমবায়, বেকারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। তারা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের স্বভাবে এগিয়ে চলছেন।
জীবনের নতুন সূচনা
৫৫ বছর বয়সি ওয়েলাত তার স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো পার করেছিলেন। এক বছর আগে তিনি জিনওয়ারে আশ্রয় নেন আর এখন প্রতিদিন সকালে কুর্দি ভাষার ক্লাস নেন, পরে গ্রামের প্রবেশপথে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। তার ভাষায়, এই গ্রামের পারস্পরিক সহযোগিতা, মানসিক সমর্থন এবং নিরাপদ পরিবেশ তাকে নতুন করে বাঁচার আরেকটি শক্তি দিয়েছে। এখানেই তিনি তাঁর হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
গ্রামে বাস করা আরেক নারী নুজিন, যিনি ৫৭ বছর বয়সী। মিহেমেদের স্বামী মারা যাওয়ার পর তার জীবনে শুরু হয় একটি নতুন যুদ্ধ। পরিবার এবং সমাজের মানুষদের মানসিক নির্যাতন, একাকীত্ব এবং অসুস্থতার সাথে দীর্ঘদিন লড়াই করার পর তিনি জিনওয়ারে আসেন। বর্তমানে তিনি গ্রামের বেকারিতে রুটি তৈরি করেন এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করেন। নুজিন বলছেন, ‘আমরা প্রত্যেকে আলাদা মানুষ তবে এখানে এসে আমরা সবাই এক পরিবার হয়ে গেছি।’
আরও পড়ুন: মায়ের জন্মদিনের উপহার বন্দুক দিয়ে ৪ জনকে হত্যা কিশোরের
জার্মানি না গিয়ে বেছে নিলেন জিনওয়ার
২৮ বছর বয়সি জেসমিনের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর আলেপ্পো ছেড়ে জার্মানিতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি জিনওয়ারের কথা জানতে পারলেন। এরপর তিনি বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা বদলে স্থানীয়ভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কুর্দি, আরব এবং ইয়াজিদি নারীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিশ্বের জন্য একটি অনন্য উদাহরণ। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি বিশ্বাস করতে শিখেছেন, পৃথিবীর সব প্রান্তের নারীরই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য এগিয়ে আসা উচিত।
পরিবেশবান্ধব আরেকটি কমিউন
নারীদের জন্য গড়ে ওঠা জিনওয়ারের পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয় অংশগ্রহণে পরিচালিত আরেকটি স্বশাসিত কমিউন হচ্ছে জারুদি। এর সহসভাপতি নেহরীমান জানান, ২০১৩ সালে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর গ্রামবাসীরা একত্রে একটি গণবাগান গড়ে তোলেন। পরে কৃষিকাজ, স্থানীয় সেবা, এবং বিভিন্ন দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে একটি সফল ব্যবস্থাপনার মডেল তৈরি করতে সক্ষম হন।
আরও পড়ুন: সিইসির পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের নতুন আন্দোলনের ঘোষণা
জিনওয়ারসহ এসব নারী-নেতৃত্বাধীন কমিউনগুলোর কোনো সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। জানা গেছে, এগুলো উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কুর্দি নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের আওতায় স্ব-ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এখানে সরকারি বা আন্তর্জাতিক তহবিলের অভাব থাকা সত্ত্বেও, এখানকার বাসিন্দারা কৃষি সমবায়, বেকারি, পশুপালন ও ক্ষুদ্র উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবন নির্বাহ করছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন