০৯:২৬ পি.এম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, এআই প্রযুক্তিকে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না।
জেনেভা থেকে এএফপি জানায়, সোমবার জেনেভায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স’-এর প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সংলাপ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন এআই ‘নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে’ এগিয়ে চলেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের নিজেদের সমাজের ওপর কোনো পরিকল্পনা ছাড়া এবং জনগণের সম্মতি ছাড়াই এক ধরনের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: পোশাক শ্রমিকদের বেতন সমন্বয়ে মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শুরু
তিনি বলেন, ‘এ অবস্থা টেকসই নয়।’
গুতেরেস বলেন, ‘এআই ইতোমধ্যে আমাদের বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, আমরা কি সম্মিলিতভাবে এ পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেব, নাকি এটিই আমাদের পরিচালিত করবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই ব্যবস্থা এখন আর কেবল নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকা একটি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম নয়।
আরও পড়ুন: নিউইয়র্কের আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নারী হিসেবে নির্বাচিত আবের কাওয়াস
তিনি মন্তব্য করেন, ‘এগুলো এখন নিজেই কোড লিখছে, অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং মানুষের তত্ত্বাবধান ক্রমাগত কমে যাওয়ার মধ্যে নিজস্ব সিদ্ধান্তও নিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এমন যন্ত্র পরিচালনার জন্য গড়ে উঠেছে, যেগুলো মানুষের নির্দেশ অনুসরণ করে। কিন্তু যে যন্ত্র নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, সেগুলো পরিচালনার জন্য এসব প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত নয়।’
গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এআই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য আরও অস্পষ্ট করে তুলছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কাজ এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং তার দেওয়া ফলাফল অন্ধভাবে বিশ্বাস করার প্রবণতাও বাড়ছে।
তিনি বলেন, নিজে প্রোগ্রামিং না করে এআইকে কী করতে হবে তা নির্দেশ দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি, অর্থাৎ তথাকথিত ‘ভাইব-কোডিং’, অনেক বিস্ময়কর কাজ করতে পারে।
আরও পড়ুন: ‘তারা ভালো কাজ করেছে’- ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানালেন ট্রাম্প
তবে তিনি বলেন, ‘সত্যকে ভাইব-কোড করা যায় না। মানবজাতির ভবিষ্যৎও ভাইব-কোড করা যায় না।’
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বড় ঝুঁকি। গুতেরেস বলেন, এআই-সংশ্লিষ্ট আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো, এ প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ অল্প কয়েকটি কোম্পানি ও অল্প কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা নেই, যা তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে দেশগুলোর সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে, পরিকল্পিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা অথবা কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়াই পরিস্থিতির স্রোতে ভেসে যাওয়া।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহেই ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট পেয়েছি: উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খান
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার বিস্তৃত সুযোগ নিশ্চিত করাসহ বহু ক্ষেত্রে এআই বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ প্রযুক্তির উন্নয়ন অবশ্যই নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সবার জন্য সমান সুফল নিশ্চিত করার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।
তিনি এআইয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও যাচাইয়ের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি এবং যৌথভাবে নির্ধারিত মানদণ্ড প্রণয়নের আহ্বান জানান। বিশেষ করে শিশুদের জন্য নিরাপদ এআই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
গুতেরেস বলেন, ‘নিরাপদ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো ওষুধ শিশুর হাতে তুলে দিই না। প্রতিটি খেলনা পরীক্ষা করা হয়।’
আরও পড়ুন: গাজায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া আদম হামাওয়ি নিউ জার্সির প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত
তিনি বলেন, ‘কিন্তু এআই ইতোমধ্যেই আমাদের শিশুদের শিক্ষা, বন্ধুত্ব এবং তাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত প্রশ্নের জগতে প্রবেশ করেছে—এটি তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সেই প্রশ্ন তোলার আগেই।’
তিনি শিশুদের সুরক্ষায় একটি ‘এআই চাইল্ড সেফটি প্লেজ’ গ্রহণের আহ্বান জানান। এর আওতায় শিশুদের জন্য উন্মুক্ত প্রতিটি এআই ব্যবস্থা নিরাপদ এবং যৌন নির্যাতনের বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করছে—এটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে প্রমাণ করতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো শিশুর মানসিক বিপর্যয়ের লক্ষণ দেখা দিলে এআই ব্যবস্থাকে তাকে অবশ্যই বাস্তব মানবিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত এআইয়ের পরীক্ষাগারের ইঁদুর হিসেবে কোনো শিশুকে ব্যবহার করা যাবে না।’
আরও পড়ুন: মহাকাশে ২২ বছর পর নাসার সুইফট দূরবীক্ষণ যন্ত্রের শেষযাত্রা
‘ঘাতক রোবট’ নিষিদ্ধের আহ্বান। গুতেরেস বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই সক্ষমতা ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি, যাতে বিদ্যমান গভীর ডিজিটাল বৈষম্য ‘এআই বৈষম্যে’ পরিণত না হয়।
তিনি জানান, দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং সাশ্রয়ী কম্পিউটিং সুবিধা নিশ্চিত করতে ‘গ্লোবাল ফান্ড ফর এআই’ গঠনের প্রস্তাব তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করবেন।
এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত প্রভাব প্রকাশ করতে হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সব ডেটা সেন্টার নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পরিচালনার অঙ্গীকার করতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার, বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্রব্যবস্থা নিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, ‘এসবকে প্রকৃত নামেই ডাকা উচিত, ঘাতক রোবট।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও বিবেচনা ছাড়াই লক্ষ্য নির্বাচন, আক্রমণ এবং প্রাণহানি ঘটাতে সক্ষম এমন যন্ত্র নৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অস্ত্র আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে হবে।’
গুতেরেস বলেন, এআইকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘মানুষ ও যন্ত্রের সহাবস্থানের শর্ত নির্ধারণ করার সুযোগ হয়তো আমাদের প্রজন্মের হাতেই শেষবারের মতো রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ সুযোগের দরজা এখনো খোলা আছে। তবে এটি বেশিদিন খোলা থাকবে না।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন