০৯:৩৯ এম
বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্পের (বি-স্ট্রং) আওতায় কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাজারমূল্যের তুলনায় অধিক দামে পণ্য ক্রয়, ভুয়া বিল তৈরি, সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়োগে অনিয়মের মতো বিষয়গুলো প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
এ সকল অনিয়ম ও তহবিল তছরুপের অভিযোগের ফলে ভেতরে অসন্তোষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নিরাপত্তার কারণে গণমাধ্যমে নাম প্রকাশে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সাবিনা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ রয়েছে। তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
আরও পড়ুন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, পিডি প্রকল্পের কেনাকাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার প্রস্তুত, সরকারি গাড়ির ব্যবহার এবং অফিসের সুযোগ-সুবিধা ব্যক্তিগত কাজে নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে কারো আপত্তি তিনি আমলে নিচ্ছেন না। প্রতিবেদকের হাতে আসা কিছু দালিলিক প্রমাণ পর্যালোচনা করেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের আত্মীয়, পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে পণ্য ও সরঞ্জাম কেনার অভিযোগও রয়েছে। নিরপেক্ষ ঠিকাদার কাজ পেলেও কমিশন না দিলে বিল আটকে রাখা কিংবা দরপত্র কার্যক্রম স্থগিতের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের নথি, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং পরিশোধের কাগজপত্র যাচাই করলে এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে।
বেশি দামে কেনার অভিযোগ
প্রকল্পের আওতায় এসি, আসবাব, কম্পিউটার, প্রিন্টারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে পণ্য কেনার অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন: সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিদেশি সফর শেষে দেশে ফিরলেন
দেখা গেছে, একই ধরনের পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়মূল্যের সঙ্গে প্রকৃত বাজারমূল্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। নিয়মিত কেনাকাটার বিল-ভাউচার পর্যালোচনায় নানা অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
পিডির কার্যালয় যেন আবাসিক কক্ষ
বি-স্ট্রং প্রকল্প কার্যালয়ের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, খামারবাড়িতে অবস্থিত প্রকল্প কার্যালয়ে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে বৈদ্যুতিক চুলা ও পানি গরমের জন্য ওয়াটার হিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের অর্থে অফিসের বাথরুম সংস্কার করে উন্নতমানের ঝরনা স্থাপনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, খাওয়া এবং গোসলসহ দৈনন্দিন নানা কার্যক্রম চলে পিডির অফিস কক্ষে। ফলে পিডির কার্যালয়টি কার্যত একটি আবাসিক কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সিসিটিভি ফুটেজ, বিদ্যুৎ বিল এবং অফিস ব্যবহারের নথি পরীক্ষা করার জোরালো দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা: ডলার ও সোনা আমদানির নিয়মাবলী প্রকাশ
সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার
প্রকল্পের তিনটি মাইক্রোবাসের মধ্যে একটি দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হলেও অন্যগুলো প্রকল্প পরিচালকের স্বামী, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। গাড়ির লগবুকে দাপ্তরিক সফরের তথ্য থাকলেও বাস্তবে ব্যক্তিগত কাজে সেগুলো ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো মাসে ২৫ হাজার টাকার বেশি ভ্রমণ ভাতা (টিএ-ডিএ) উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি বিল তৈরি এবং তা অনুমোদনে চাপ দেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সংশ্লিষ্ট সময়ের ভ্রমণসূচি, অফিস আদেশ, গাড়ির লগবুক ও জ্বালানি বিল যাচাই করলেই এর সত্যতা মিলবে।
নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ
আরও পড়ুন: কৃষিমন্ত্রী: নিয়মবহির্ভূত সবকিছুই পরিচ্ছন্নতার আওতায় আসবে
প্রকল্পের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা যন্ত্রপাতির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো বা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ কৃষকদের হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশন, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল ও গ্রহণের সনদ মাঠপর্যায়ে যাচাই করা জরুরি।
শ্রমিকের বেতন ও পরামর্শক নিয়োগে অনিয়ম
প্রকল্পের অনিয়মিত শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি প্রকল্পের ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আগা আজাহারুল ইসলামের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক মূল্যায়নে নির্ধারিত নম্বরের ভিত্তিতে পিছিয়ে থাকলেও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার পিডির
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনকে শোকজ
অভিযোগের বিষয়ে বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন আমার দেশকে বলেন, "আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি অফিসটা সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য। ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে কাজ করি না। প্রকল্প কীভাবে ভালোভাবে চলবে, সেদিকেই সবার ধ্যান-জ্ঞান।"
ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, এ বিষয়ে তার ভালো দক্ষতা রয়েছে। তাই অনিয়ম করার সুযোগ নেই। দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "কোনো ঠিকাদারকে আমি চেনেনা। প্রকল্পের কোনো কিছুই আমি ব্যক্তিগতভাবে বা পরিবারের সুবিধার জন্য ব্যবহার করি না।"
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
প্রকল্পের কেনাকাটা, দরপত্র, বিল-ভাউচার, গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার, ভ্রমণ ভাতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, গত কয়েক বছরের দরপত্রের নথি, ক্রয়াদেশ, অর্থ পরিশোধের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ির লগবুক ও মাঠপর্যায়ের সরবরাহের তথ্য নিরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নীত করবে: জহির উদ্দিন স্বপন
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান আমার দেশকে বলেন, "প্রত্যেকটি প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কারও বিরুদ্ধে অসংগতি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উল্লেখ্য, তিন বছর মেয়াদি বি-স্ট্রং প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালের জুনে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অংশে প্রকল্পটির বরাদ্দ ১৩১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর অগ্রগতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের গড় অগ্রগতির চেয়ে কম বলে জানা গেছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন