১২:৪০ এম
নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের সেবা কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। নির্ধারিত ডেলিভারি তারিখের আগেই পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই। নগরীর বিভিন্ন মসজিদে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যাতে দালালচক্রের খপ্পরে না পড়ে এবং ভোগান্তি ছাড়াই পাসপোর্ট পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। দালালমুক্ত ও হয়রানি মুক্ত পাসপোর্ট অফিস গড়ে তোলার জন্য নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। পুরো অফিসের সিস্টেমকে ঢেলে সাজানো হয়েছে।
যদি কোনো আবেদনকারীর নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বয়সসহ অন্যান্য তথ্য ভুল হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া, যদি কোনো আবেদনকারীর কাগজপত্র মিসিং থাকে, তবে সেটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে অফিসের কম্পিউটারে প্রিন্ট করে আবেদন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একজন গ্রাহক সাতদিন, ২১ দিন বা এক মাস মেয়াদি সময়ের মধ্যে ব্যাংকে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আবেদনের কপি কাউন্টারে জমা দিলেই আধা ঘণ্টার মধ্যে ডাক পড়ে ছবি তোলা, আইরিস ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার জন্য। ফলে পাসপোর্ট করতে আসা মানুষজন অনেকটা স্বস্তিতে পাসপোর্ট করতে পারছেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাচ্ছেন
মেইন গেইটে আনসার সদস্যরা প্রতিটি মানুষের পাসপোর্ট অফিসে আসার কারণ জেনে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। এর ফলে দালালচক্রের সদস্য বা অবাঞ্চিত কোনো লোক প্রবেশ করতে পারছে না। কোনো প্রকার হয়রানি ও ভোগান্তি ছাড়া পাসপোর্ট করতে পেরে খুশি নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের সেবা নিতে আসা মানুষ।
পাসপোর্ট অফিসের গেইটে এবং মাঠের এক জায়গায় সাউন্ড সিস্টেম স্থাপন করে সেবা গ্রহীতাদের সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। গ্রাহকদের দালাল চক্রের খপ্পড়ে পড়ে বেশি টাকা ব্যয় না করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অফিসের আশেপাশে কোনো দোকান বা কম্পিউটারের দোকানির কাছে না গিয়ে নিজে নিজে ই-মেইল করে আবেদন ফরম পূরণ করাসহ অফিসের কর্মচারীদের সহায়তা নেওয়ার জন্যও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে মাইকিং করে। পাসপোর্ট করতে আসা লোকজনের বসার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ফ্যান লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অথচ মাত্র ৭/৮ মাস আগে পাসপোর্ট সেবা গ্রহণ করতে এসে সেবা গ্রহীতাদের দালাল চক্রের খপ্পরে পড়তে হতো। আবেদন কপি জমা দেওয়া থেকে শুরু করে আইরিশ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া এবং ছবি তুলতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এই কক্ষ থেকে ওই কক্ষে ঘুরতে ঘুরতে হয়রানি হতে হতো। আবার আবেদনে ভুল হলে নতুন করে আবেদন করতে হতো। সাত দিন বা ২১ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে এক মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো। দালাল চক্রের সদস্যরা পাসপোর্ট অফিসের ভেতরেই ঘুরঘুর করতো। কর্মকর্তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো এসব দালালচক্রের সদস্যরা।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কার্ড বাগিয়ে এনআইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে দাপটের সঙ্গে দালালি করে টাকা কামিয়ে নিতো। এসব ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক নামধারী দালালদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতো না। আবার পাসপোর্ট অফিসের কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী এসব দালালচক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কমিশন নিতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আরও পড়ুন: রাজবাড়ী জেলা কারাগারে হাজতি নারায়ণ চন্দ্র দাসের মৃত্যু
দালালচক্রের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একাধিকবার অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করার পরও পাসপোর্ট অফিস থেকে দালালদের তাড়ানো যেতো না। কারণ অভিযানের কিছুদিন পর অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজসে আবার ফিরে আসতো দালালচক্র।
তবে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বর্তমান উপ-পরিচালক আবু নাঈম মাসুম যোগদানের পর থেকে পাসপোর্ট সেবার চিত্র বদলে যেতে থাকে। উপ-পরিচালকের কঠোর দিক নির্দেশনা, পরিশ্রম ও নিয়মিত মনিটরিং এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে পাসপোর্ট অফিসে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ে সরেজিমন ঘুরে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। গেইটে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করছে আনসার সদস্যরা। প্রবেশের সময়ে পড়তে হচ্ছে জেরার মুখে। কি কারণে পাসপোর্ট অফিসে এসেছে তার কারণ বলে প্রবেশ করতে হচ্ছে প্রতিটি সেবা নিতে আসা মানুষকে।
গেইটে প্রবেশের মূল ফটকে ও অফিসের মাঠের খালি স্পেসের এক জায়গায় বসানো হয়েছে দুটি সাউন্ড বক্স। এই সাউন্ড বক্সে সার্বক্ষণিক প্রচার করা হচ্ছে দালাল চক্রের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি অফিসে এসে নিজের পাসপোর্ট নিজে করার জন্য, কাগজপত্র এবং ফরম পূরণ করার জন্য। পাসপোর্ট করার জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন সেটি বলা হচ্ছে। এছাড়া একটি বড় এলইডি ডিসপ্লেতে দিন রাত ২৪ ঘণ্টা প্রচারণা চালানো হচ্ছে পাসপোর্ট করতে কী কী কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
আরও পড়ুন: শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা ১৫ হাজার কেজি লাল চিনি জব্দ
সোনারগাঁয়ের পানাম নগরীর লেকসিটি এলাকা থেকে আখি বেগম তার পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে এসেছেন পাসপোর্ট করতে। তিনি জানান, সরকারি ফি’র বাইরে কোনো প্রকার হয়রানি ও ঝক্কি ঝামেলা ছাড়া নির্ধারিত সময়ে আগেই পাসপোর্ট হাতে পেয়েছি।
ফতুল্লার রসুলবাগ এলাকার বাসিন্দা আরফান আহমেদ জানান, রোমানিয়া যাবার জন্য পাসপোর্ট করতে এসেছি। দালাল ছাড়াই আবেদন করে আবেদনের কপি জমা দেওয়ার মাত্র ২০-২৫ মিনিট পরই ছবি, চোখের ও হাতের আঙ্গুলের ছাপ দিয়েছি।
কাচঁপুরের শামীম আহমেদ জানান, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে পাসপোর্ট অফিসে এসেছি। এখানকার কর্মকর্তারা সহযোগিতা করায় খুব দ্রুত ছবি তোলাসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেছি ভোগান্তি ছাড়াই। দালালমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে পাসপোর্ট করতে আসা লোকজন কাউন্টারে আবেদনের কপি জমা দিয়ে আধা ঘণ্টার মধ্যে ছবি তোলা, চোখের আইরিশ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে চলে যাচ্ছেন।
আবার পাসপোর্টের প্রিন্ট হয়ে চলে আসছে নিয়ে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। শৃঙ্খলা ফেরাতে আনসার সদস্যরা হ্যান্ড মাইক দিয়ে দিক নির্দেশনা দেন। যাতে ভিড় না করে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৭৩টি সেলাই মেশিন বিতরণ
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক আবু নাঈম মাসুম জানিয়েছেন, প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করার কারণে ভোগান্তি কমে এসেছে। পাসপোর্ট অফিসের সেবা নিতে সরকারি ফি ছাড়া এর বাইরে কোনো টাকা পয়সা দিতে হয় না। সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জেলার প্রতিটি মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার আগে বা পরে ইমাম মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যাতে সাধারণ মানুষ সচেতন হয়। কম্পিউটারে পাসপোর্ট ওয়েব সাইটে প্রবেশ করে ফরম পূরণ করে গ্রাহকরা যেন ব্যাংকে সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আবেদনের কপি নিয়ে এলে কোনো আবেদনে কোন ভুলক্রটি ধরা পড়লেই তা আমাদের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে তৎক্ষণিক সংশোধন করে দেওয়ার জন্য।
শুধু তাই নয়, পাসপোর্ট অফিস দালালমুক্ত করার জন্য নেওয়া হয়েছে নানা রকমের ব্যবস্থা। তিনি বলেন, রোগী, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, হজেগমনে ব্যক্তি, গর্ভবতী মা ও শিশু, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফাস্ট প্রায়োরিটি দেওয়া হয়।
এছাড়া যে ব্যক্তি নিজে কোনো দালালের সহযোগিতা ছাড়া পাসপোর্টের ফরম পূরণ করে আসে তাকে প্রায়োরিটি বেসিসে কাজ করে দেওয়া হয়। আর যারা দালাল ধরে আসে তাদের লাইন দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
তিনি বলেন, সাত দিনের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য যারা আবেদন করছেন, তাদের পাসপোর্ট ৫ দিন বা ছয় দিনের মধ্যেই ডেলিভারির জন্য চলে আসছে। যারা ২১ দিনের জন্য বা কেউ এক মাস বা তারও বেশি সময়ে মধ্যে আবেদন করছেন, তাদের পাসপোর্ট নির্ধারিত ডেলিভারী তারিখের চার-পাঁচ দিন আগেই চলে আসছে। আমাদের ম্যাসেজ পেয়ে তারা পাসপোর্ট বুঝে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, এই কারণে দালালচক্রটি নাখোশ হয়ে নানা অবান্তর ও মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মধুপুরে দুর্গোৎসব উপলক্ষে বস্ত্র ও নগদ অর্থ বিতরণ করলেন আইসিটি মন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন