০৫:৪৪ পি.এম
পঞ্চগড়, ১১ আগস্ট, ২০২৬ : কারও বয়স তখন ছিল মাত্র ৬ বছর। কেউ হারিয়েছেন বাবাকে, আবার কেউ মাকে, এবং কারও জীবনে বাবা-মা দুজনেরই কোনো স্মৃতি নেই। কেউ পরিবার থেকে হারিয়ে গেছেন, আবার কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছেন অনাথ আশ্রমে। আপনজনের স্নেহ ও ভালোবাসা, পাড়া-প্রতিবেশীর পরিচিত মুখ কোনোটিই তাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠেনি।
তবে জীবন তাদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা ৯ কিশোর উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের মধ্যে কিছুর চোখে পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন, আবার কারও স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার। এসএসসি পাসের আনন্দের মধ্যে কোথাও যেন মিশে রয়েছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন তারা হলেন সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন, সাকিব, নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম ও আলিউল ইসলাম। এরা সবাই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন: হেলমেট পরে এসে চায়ের দোকানে বসা বৃদ্ধকে গুলি
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী। এটি একটি প্রতিষ্ঠান যা অনাথ, ছিন্নমূল, বঞ্চিত ও হারিয়ে যাওয়া পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে সেখানে ১৬০ জন শিশু রয়েছে।
শিশু নগরীতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বড় ভবনের মাঝে বিশাল এক খেলার মাঠ। মাঠজুড়ে শিশুদের হাসি-खিলখিল। কারও হাতে বই, কেউ ব্যস্ত খেলায়। এর মধ্যেই সদ্য এসএসসি দীপ্তি লাভ করা নয় জন কিশোরের মুখে ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস।
সুমন মিয়া বলেন, ৬ বছর বয়সে তিনি পরিবার থেকে হারিয়ে যান। এরপর একটি সেন্টারে থাকার পর ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আসেন। দীর্ঘ ১০ বছর এখানেই কাটিয়েছেন তার শৈশব ও কৈশোর।
সুমন জানালেন, “৬ বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে গেছি। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। পরে একটি সেন্টারে ছিলাম। সেখান থেকে মালেক স্যারের মাধ্যমে ২০১৫ সালে এখানে আসি। এখানে ১০ বছর পড়াশোনা করার পর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।”
আরও পড়ুন: নেত্রকোনায় নিজ হাতে ড্রেন পরিষ্কার করলেন জেলা প্রশাসক
কথা বলার এক সময় পরিবারের প্রসঙ্গ এলে সুমনের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেন, “হয়তো আমার পরিবার আমার সঙ্গে থাকলে তারাও অনেক খুশি হতো। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, তাও জানি না। আমার পরিবারের কোনো ঠিকানা নেই।”
নিরব হাসানও প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে আছেন। এখান থেকেই পড়াশোনা করে তিনি পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছেন।
নিরব বলেন, “আমি ১০ বছর ধরে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আছি। এখান থেকে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করেছি। আমি খুব খুশি।” ভবিষ্যতে কী হতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে তার সহজ উত্তর, “বড় হয়ে একজন ভালো মানুষের মতো মানুষ হতে চাই।”
আনিছুর ইসলামের বাবার মৃত্যু হয়েছিল শিশু বয়সেই। সংসারের অভাবের কারণে তার মা তার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে আহছানিয়া মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে এখানে ভর্তি করা হয়।
আরও পড়ুন: নাসিরনগরের পূর্বভাগ পুরাতন বাজারে ইয়াবাসহ নারী-পুরুষ আটক
আনিছুর বলেন, “ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যান। পরে এই মিশনের কথা জানতে পেরে আমাকে এখানে পাঠান। প্রায় ১১ বছর ধরে এখানে আছি। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪ পেয়েছি।”
মেহেদি হাসানের বাবাও ছোটবেলায় মারা যান।স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর পাশাপাশি মায়ের পক্ষে ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মেহেদি বলেন, “বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছে। তখন মা সংসার চালাতে পারছিলেন না, আমাকে পড়াশোনাও করাতে পারছিলেন না। পরে এখানে নিয়ে আসেন। স্যাররা পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও থাকার সব ব্যবস্থা করেছেন। এখানে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে ভালো ফল করেছি। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি শিশু নগরীতে আছেন।”
আল-আমিন ইসলাম ৭ বছর বয়সে হারিয়ে যান। এরপর আর খুঁজে পাননি বাবা-মাকে। এসএসসি পাসের আনন্দের দিনেও সেই শূন্যতার কথা মনে পড়ে তার।
আরও পড়ুন: ৯ দিন পর বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি শুরু
আল-আমিন বলেন, “আজকের ফলাফল শুধু আনন্দের নয়, এর সঙ্গে একটা কষ্টও আছে। যদি আজ আমার বাবা-মা আমার পাশে থাকতেন, তাহলে ভালো লাগত। অন্যদের বাবা-মা সন্তানদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় পাশে থাকেন, ফলাফল হলে খুশি হন। আমিও তো তাদের ছেলে। আমি পাস করেছি তারা যদি জানতে পারত, তারাও নিশ্চয়ই খুশি হতো।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে তার স্বপ্নও স্পষ্ট। আল-আমিন বলেন, “বড় হয়ে একজন সুনাগরিক হতে চাই। সৎভাবে চলতে চাই। যে কাজই করি, সততা নিয়ে করবো। সবসময় সত্যের পথে চলবো।”
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন, “দেশের বিভিন্ন রেলস্টেশন, ফেরিঘাট, নদীভাঙনকবলিত এলাকা ও হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিশুদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়। যাদের বাবা-মা নেই কিংবা যারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।”
তিনি বলেন, “আমরা শিশুদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলছি। এবারের ফলাফলও ভালো হয়েছে। এভাবেই শিশুরা এখানে সুরক্ষিতভাবে বেড়ে উঠছে।”
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৮৩ জন
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীর সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় বলেন, “২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতিম ও পথশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ৫ বছরে আমাদের এখান থেকে ৪৮ জন শিশু এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। অনেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এবারও ভালো ফল হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে অনেক শিশুর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। এখানে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে। তাদের নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়। শিশুদের ভালো ফলের পেছনে নিয়মিত পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ ও স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।”
দীপক কুমার রায় আরো জানান, “২০২১ সাল পর্যন্ত দাতা সংস্থার অর্থায়নে শিশু নগরীর কার্যক্রম চললেও বর্তমানে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “সামাজিক সুবিধায় অবস্থানশীল ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিশুদের আরও ভালোভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমরা চাই, এখান থেকে বের হয়ে তারা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরে যাবে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।”
আরও পড়ুন: গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে ২ নিহত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন