০১:০৭ এম
গত নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর, যখন বিএনপি জামায়াতকে সরকারের অংশ করতে অস্বীকার করে, তখন থেকেই জামায়াত বিএনপির পিছনে লাগা শুরু করে। বাস্তবিকভাবে নির্বাচন বানচাল কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার আন্দোলন হালে পানি না পাওয়ায় এনসিপি-জামায়াত নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়। যে দুই দলের লক্ষ্য ছিল ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধাগুলোকে অক্ষুণ্ন রাখা। প্রকৃতপক্ষে, সেসময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্তরালে এনসিপি-জামায়াতই ক্ষমতায় ছিল এবং তাদের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। এই ব্যবস্থা যে অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না, সেটা বুঝেও তারা চেষ্টা করেছে যতদিন সম্ভব এটিকে টেনে নিয়ে যেতে। সে প্রচেষ্টার শেষে তারা ড. আলী রিয়াজের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্তকরণ ও তা বাস্তবায়নের আদেশ জারি করে, যা আইন বহির্ভূত ও জালিয়াতিতে পরিপূর্ণ ছিল বলে বোদ্ধাজনেরা মনে করেন।
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে জামায়াতের আমির বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে সরকারের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলেও জানাবার তারেক রহমান তাতে সম্মত হননি। এতে ক্ষুব্ধ এনসিপি-জামায়াত নির্বাচনের পরদিন থেকেই এই নবনির্বাচিত সরকারের পতনের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। সরকার গঠনের পরদিন থেকে শুরু হওয়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা সত্য-মিথ্যা নানা বিরোধিতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এই ক্যাম্পেইনের থেমে যাওয়া বা এর গতি কমারও কোনো লক্ষণ যদি দেখা যায়, তখনই সেটি স্পষ্ট হবে।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে খেলে। মূলদল ছাড়াও এনসিপি, এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ পার্টি নামের সংগঠন যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে ‘দেশের সাধারণ জনগণ’, ‘সাধারণ মানুষ’, ‘ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক’ প্রভৃতির নানা ফোরাম। যেকোনো নতুন পরিস্থিতিতে নতুন নতুন নামে নতুন অ্যাজেন্ডা নিয়ে হাজির হচ্ছে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। আর তাদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবের জায়গা বলাবাহুল্য সামাজিক মাধ্যম।
আরও পড়ুন: বিমানবন্দরের আয়নায় বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
এই সব ফোরামে নানা ইস্যু এবং নন-ইস্যু নিয়ে তারা মাঠ গরম করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিএনপির নবগঠিত সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলা যাতে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি তুলতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো বিএনপির সরকার অতীতের রেকর্ড ভেঙে নির্বাচনের পরও শুধু জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, সাথে তাদের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। এর সিংহভাগ কৃতিত্ব দলের শীর্ষ নেতা জনাব তারেক রহমানের জনগণের সাথে মিশে যাওয়া ও সরকারের কার্যক্রমকে জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। সংসদ সদস্যদের জন্য করমুক্ত গাড়ি ক্রয়ের বিধান বাতিল, রাজউকের প্লট না নেবার ঘোষণা প্রভৃতির মাধ্যমে জনাব তারেক রহমান জামায়াতকে ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য করেছেন। তাদের নির্বাচন পূর্বে গাড়ি, প্লট বা ফ্ল্যাট না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর যখন তারা দেখছে, যে এসব সুবিধা প্রকৃতপক্ষেই আর পাওয়া যাবেনা, তখন তার বিকল্প হিসেবে সরকারি গাড়ি, অফিস এমনকি বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে মাইক্রোওয়েভ ওভেন, পর্দা, ওয়াশিং মেশিনের মতো সামান্য ইনিসের জন্য সংসদে দাবিনামা পেশ করছেন। এসব যে প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়ার হতাশা/বেদনা থেকে আসছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
জামায়াতে ইসলামী এদেশে কখনোই রাজনীতির মূল খেলোয়াড় ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের আত্মপ্রকাশের পর থেকেই তারা বড় দুটি রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে থেকেছে। সে সময়গুলোতে তারা এই দুই দলের ছত্রছায়ায় থেকে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির সহায়ক হিসাবে কাজ করেছে এবং গোপনে নিজেদের দল সংগঠন করেছে। সেই হিসেবে তারা যুগপৎ আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য লাভ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। জামায়াতে ইসলামী ১৯৪১ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বর্তমানে উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রে সক্রিয় রয়েছে। ভারতে তারা একটি দুর্বল প্রেসার গ্রুপ ছাড়া আর কিছু হতে পারেনি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে তাদের সংগঠন জাতীয় রাজনীতিতে একটা অবস্থান নিলেও তারা এই দুই দেশে মোটামুটি আউটসাইডার হিসেবেই এতদিন অবস্থান করেছে।
১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৫ শতাংশের কম ভোট পেয়েছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রায় ১২ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল এবং সংসদের ১৭টি আসনে জয় লাভ করেছিল। এটি যথাযথভাবে জামায়াতের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করলে, তাদের ভোট আবার ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, সেবার তারা মাত্র ৩ টি আসনে জয় লাভ করে। পরে ২০০১ সালে তারা বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে, তাদের প্রাপ্ত ভোটার হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলেও তারা ১৮ টি আসনে জয়ী হতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানে তাদের অবস্থান তার চেয়েও খারাপ। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে তারা ২ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেলেও, তারা পার্লামেন্টে কোনও আসন পায়নি। সেই প্রেক্ষাপটে এবার ২০২৬ এর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট ও ৬৭টি (তাদের অন্যান্য প্লাটফর্মসহ মোট ৭৭ টা) আসনে জয় পাওয়ার পর তাদের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ হয়। তারা এটা বলবার চেষ্টা করছেন যে এবারের নির্বাচনের ফলাফল দেশের মানুষের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি; কিন্তু এর মাধ্যমে তারা যা বুঝাতে চাচ্ছে, বাস্তবতাটা হলো ঠিক তার বিপরীত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনগুলিতে তারা ৩১-৩৫ শতাংশের মধ্যে ভোট পেয়েছে। একথা অনস্বীকার্য যে শেখ হাসিনার ক্ষমতার প্রতি অদম্য আকর্ষণ এবং তার স্বজনপ্রীতি ও অর্থের প্রতি তীব্র লোভের কারণে আওয়ামী লীগ দেশের জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। আসলে শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের সদস্যদের এই দেশটার প্রতি কোনো মমতা বা ভালবাসা ছিল না। তিনি তার পিতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এবং তার ব্যক্তিগত লোভ-লালসা চরিতার্থ করার জন্য আমাদের দেশটাকে বেছে নিয়েছিলেন। আর তাকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত তাদের নানা অন্যায্য সুবিধা আদায়ের ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহারের জন্য। শেখ হাসিনার শাসনামলের সাড়ে পনেরো বছরে তিনি ও তার আত্মীয়-স্বজন এবং তার দলের মাফিয়ারা দেশটাকে সাক্ষাৎ নরক বানিয়ে ফেলেছে। এসময়ে তিনি ও তার লোকজন দেশ থেকে ৩২৪ বিলিয়ন ডলার শুধু বিদেশে পাচার করেছে। তাছাড়া ব্যাংক লুট, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, গুম-খুনের মাধ্যমে দেশ থেকে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে রাখা, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে দলীয়করণ, কোনও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে না দেওয়া প্রভৃতি কারণে শেখ হাসিনা ও তার দলের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমে আসে এবং গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা থেকে অপসৃত হন এবং পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত তাদের জন্য অভাবনীয় সফলতা পায়।
বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অন্যান্য দেশের রাজনীতি থেকে কিছুটা ভিন্ন। উপমহাদেশের অপর দুইটি দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতিই মূল রাজনৈতিক ধারা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এদেশে নেতৃত্ব যে শুধুমাত্র কোনও একক পরিবার থেকে আসে তা নয়, এদেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও পরিবার পরম্পরায় একই দলের রাজনীতি করে অভ্যস্ত। খুব বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে এদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন করে না। গত গণ-অভ্যুত্থানে সে ধরনের একটি বিশাল ঘটনা ঘটে। গণ-অভ্যুত্থানের পরে দেশের আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অল্প কিছু অংশ তাদের রাজনীতি ও সমর্থনের দল পরিবর্তনের চিন্তা ও চেষ্টা করে। যারা আওয়ামী ভাবধারার রাজনীতিতে অভ্যস্ত, তাদের জন্য জামায়াত কোনও অপশন নয়। তারা বিকল্প হিসেবে এনসিপি এবং বিএনপি নিয়ে ভেবে থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর এনসিপির নেতৃত্বের অপরিমেয় লোভ-লালসা, চাঁদাবাজি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, দখলদারি, মব-সন্ত্রাসের কারণে তারা জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা দ্রুত হারিয়ে ফেলেছে। জামায়াতের মিথ্যাচার ও মুনাফেকি নির্ভর রাজনীতির পাশাপাশি ক্ষমতার সব কেন্দ্র দখলের অপচেষ্টা এবং সবকিছু গ্রাস করে ফেলার প্রবণতার কারণে ভয় পেয়ে অনেক আওয়ামী লীগ লোকও বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। আর যারা এনসিপি-জামায়াতকে ভোট দিয়েছে, তারাও তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে।
আরও পড়ুন: দেশের ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫.০৭ মেগাওয়াট
বিবিসির সাথে একটি সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মরহুম ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন যে বাংলাদেশে দুটি বিষয় 'Non Negotiable', যার একটি হলো ইসলাম এবং অপরটি হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে জনাব রাজ্জাকের এই উপলব্ধিটা আমার কাছে সঠিক ও শ্রেষ্ঠ অনুভব হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বয়ং জামায়াতই বিষয়টিকে আমলে নেয়নি, যার কারণে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে দল ছাড়তে হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনীতি রাজনীতিকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজেদেরকে হাস্যস্পদ করে ফেলেছে, তেমনি জামায়াত ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলেছে। আর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও, মিথ্যাচার, অপরিসীম লোভের কারণে তারা দেশের মানুষের আস্থার জায়গাটি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া তাদের দলে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত লোকেরও খুব অভাব রয়েছে। বিশেষ করে এবারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে এমন সব মানুষ রয়েছেন, যারা সংসদ বিষয়টিই না বুঝে, উল্টাপালটা বক্তব্য দিয়ে নিজেদের আরও খেলো করে তুলছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যেমন ভারত-নির্ভর রাজনীতি করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তেমনি জামায়াতও অতি পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির চর্চা করতে গিয়ে গত গণ-অভ্যুত্থানকালের নিজেদের অর্জনগুলিকে হারিয়ে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির দল বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে বিএনপি বর্তমানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে রয়েছে; এবং জামায়াত দায়িত্বশীল বিরোধীদলের স্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য ভারত ও কিছু পশ্চিমা দেশ এই দেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। বিএনপি এ বিষয়ে একমত। বিএনপি মনে করছে এই দেশে বিএনপি ছাড়াও একটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল থাকা প্রয়োজন যারা প্রয়োজনে বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব একটা বিরাট প্রতিবন্ধকতা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এমন একটি ‘মেগালোমনিয়াকে’ পরিণত হয়েছেন যে তিনি তার চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সবকিছুকেই সন্দেহ ও পরিত্যাজ্য বিবেচনা করেন। বস্তুতঃ তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফলে তিনি অনিরাময়যোগ্যভাবে মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়েছেন এবং সাইকোটিক হয়ে গেছেন। এরপর তার স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা করার যে সামান্য ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল, তা লোভী-চাটুকারেরা মোসাহেবির মাধ্যমে নিঃশেষ করে ফেলেছে।
গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে লজ্জাজনকভাবে ক্ষমতাচ্যুতি ও পলায়নের পর, তার নিজের ও তার দলের কর্মকাণ্ড নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগের ও এর নেতৃবৃন্দের দোষ-ত্রুটিগুলোকে চিহ্নিত করা দরকার ছিল। রাজনীতিতে ফিরতে চাইলে দেশের মানুষের সাথে সংঘটিত অন্যায়-অপকর্মগুলির জন্য অনুতাপ না করলে দেশের মানুষ কেন তাদেরকে ক্ষমা করবে বা আবার আস্থায় নেবে? কিন্তু আত্মম্ভরি শেখ হাসিনা সেসবের দিকে যাননি। তিনি মনে করছেন कि তার সময়ে প্রয়োজনের চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয়ে করা উন্নয়ন কাজের জন্য দেশবাসী তাঁকে আবার গ্রহণ করবে! কী নিদারুণ দিবাস্বপ্ন! বস্তুতঃ শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে থাকাকালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কখনোই মূল খেলোয়াড় হতে পারবে বলে মনে হয় না। গত দুই দশকে যেভাবে আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনও ব্যক্তি ওই দলে নেই। তাছাড়া শেখ হাসিনার সাথে তার দলের সব চোর-বাটপারও পালিয়ে গেছে। তারা এখন বিদেশের মাটিতে বসে দেশের সরকার ও গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের মানুষদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, যা তাদের প্রতি দেশের মানুষের ভীতি ও বিতৃষ্ণাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। দেশে অবস্থানরত তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে টাকার বিনিময়ে রাস্তায় চোরাগোপ্তা মিছিল করে ভাবছে আওয়ামী লীগকে দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছে। ঢাকা বা দেশের বিভিন্ন শহরের রাজপথে ৫০-১০০ জনের মিছিল শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনবে, এই চিন্তাটা শুধু বালখিল্য নয়, দিবাস্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু।
এনসিপি-জামায়াতের অস্থিরতা এবং অহর্নিশ ষড়যন্ত্রের কারণে অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। বিএনপির গত নির্বাচনী ইশতেহারেও সে বিষয়ে একটি পথ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বিষয়টি বিএনপি বিবেচনা করবে প্রয়োজন অনুভব করলে, এবং তা হবে বিএনপির জন্য সুবিধাজনক সময়ে। কিন্তু কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা এবং দেশের মানুষের আস্থাভাজন না হয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলে, তা আওয়ামী লীগের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং তা তাকে অবশ্যম্ভাবী বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেবে।
আরও পড়ুন: মিসরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ১৩ জনের মৃত্যু, আহত ৩৪
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন