০১:৪৫ পি.এম
আয় বাড়লেও প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল মুনাফার পূর্বাভাস এবং বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমার আশঙ্কায় জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স চাপের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের মূল ব্যবসা—মানসম্মত সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠান তৈরিতে অধিক মনোযোগ দিতে চায়। একই সঙ্গে, নিজেদের কনটেন্ট তৈরির কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন নেটফ্লিক্সের সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টেড সারানডোস।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, নেটফ্লিক্সের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১২৮৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে, এটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির আয়ের প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে কম হার প্রায় তিন বছরের মধ্যে। পাশাপাশি, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে মুনাফার যে পূর্বাভাস প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছে, তা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় কম।
নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, চতুর্থ প্রান্তিকে তাদের নিট মুনাফা হতে পারে ২৭৯ কোটি ডলার। শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হতে পারে ৬৭ সেন্ট। অথচ বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল নিট মুনাফা ৩০৭ কোটি ডলার এবং শেয়ারপ্রতি আয় ৭৩ সেন্ট। এই পূর্বাভাস প্রকাশের পর মঙ্গলবার লেনদেন-পরবর্তী সময়ে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৬৪ দশমিক ৬৬ ডলারে নেমে আসে।
আরও পড়ুন: অ্যানথ্রোপিকের সতর্কবার্তা: এআই মানবজাতির জন্য ‘বিপর্যয়কর ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের পূর্বাভাসও কমিয়েছে নেটফ্লিক্স। পূর্বে এ খাত থেকে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার আয়ের প্রত্যাশা থাকলেও, এখন তা কমিয়ে প্রায় ২৭০ কোটি ডলার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনসংশ্লিষ্ট কিছু সুবিধা চালুর কাজ প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে এগোনোয় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা।
মূল কনটেন্টে ফিরতে চায় নেটফ্লিক্স
আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং দর্শকদের আকৃষ্ট করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিডিও গেম, পডকাস্ট ও সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে নেটফ্লিক্স। তবে ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে দর্শকসংখ্যা বাড়ায় প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে, নেটফ্লিক্স কিভাবে নতুন দর্শক টানবে এবং পুরনো গ্রাহকদের ধরে রাখবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন।
বিনিয়োগ বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান পিপি ফোরসাইটের পাওলো পেসকাতোরের মতে, নেটফ্লিক্স এখনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও, মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে এমন কিছু কাজে মনোযোগ দিচ্ছে, যেগুলো দর্শকদের কাছে ততটা আকর্ষণীয় নয়। তাঁর মতে, দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরিতে আবারও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: সরকারের পাঁচ বছরে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য: মাহবুব আনাম
নেটফ্লিক্সের সহ-সিইও টেড সারানডোসও মূল ব্যবসায় মনোযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক ভিডিও কলে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আমরা আরো ভালো করতে পারি।’ তাঁর মতে, কনটেন্টের মান ও বৈচিত্র্য আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
সারানডোস জানান, সাম্প্রতিক নির্বাহী পর্যায়ের রদবদলও সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি পদক্ষেপ। তিনি জানান, নেটফ্লিক্স এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে থাকতে চায়, যেখানে সৃজনশীল ব্যক্তিরা নিজেদের সেরা কাজ করতে আগ্রহী হবেন। পাশাপাশি, তৃতীয় পক্ষের তৈরি কনটেন্ট লাইসেন্সের মাধ্যমে নিজেদের সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
কর্মী ছাঁটাই ও শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল
নেটফ্লিক্সের এই পরিবর্তনের উদ্যোগ এসেছে কর্মী ছাঁটাই ও শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব বদলের পর। গত সপ্তাহে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা তাদের মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ। এর আগে কনটেন্ট বিভাগের প্রধান বেলা বাজরিয়াকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় ডিজনি ও ফক্সের সাবেক নির্বাহী পিটার রাইসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়া চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান ড্যান লিনও প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ছেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশকে এআই কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার: তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো নেটফ্লিক্সের কনটেন্ট তৈরির পরিকল্পনায় নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দেয়। তবে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সারানডোস জানিয়েছেন, কৌশলে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও কার্যকর করতে হবে।
এদিকে, চলতি বছরের শুরুতে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে অধিগ্রহণের প্রতিযোগিতায় হেরে যায় নেটফ্লিক্স। প্রতিষ্ঠানটির সমৃদ্ধ কনটেন্ট সংগ্রহ শেষ পর্যন্ত ডেভিড এলিসনের নেতৃত্বাধীন স্কাইড্যান্সের হাতে যায়। ভবিষ্যতে অন্য প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তবে, নেটফ্লিক্সের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রাহকসংখ্যা ও ব্যবসার পরিস্থিতি বোঝাতে কিছু বাইরের তথ্য পুরোপুরি প্রতিনিধিত্বশীল নয়। সারানডোসের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও ভালোভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা এবং দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি করা।
আয় বাড়লেও মুনাফার পূর্বাভাস ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায় চাপ নেটফ্লিক্সকে নতুন করে নিজেদের অগ্রাধিকার নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। এখন মূল কনটেন্টের মান বাড়ানো এবং দর্শকদের ধরে রাখার কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী প্রবৃদ্ধি।
আরও পড়ুন: টেলিটক ৭০০ মেগাহার্টজে ফোর-জি সম্প্রসারণের জন্য জেডটিই’কে কার্যাদেশ দিল
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন