ঢাকা সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহর ইতিহাস: ভিন্ন ভূখণ্ডে বিপ্লবী চেতনা


উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহর ইতিহাস: ভিন্ন ভূখণ্ডে বিপ্লবী চেতনা

ইতিহাস কখনো কখনো এমন এক অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করে, যার এক প্রান্তে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, অন্য প্রান্তে বাংলার নদীবিধৌত জনপদ। মাঝখানে হাজার মাইলের দূরত্ব, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি; অথচ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনার কান্না আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যেন একই ভাষায় কথা বলে।

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ—পৃথিবীর দুই প্রান্তে আবির্ভূত হলেন দুই মানুষ। পশ্চিম আফ্রিকায় উসমান দান ফোদিও (১৭৫৪–১৮১৭), আর বাংলার মাটিতে হাজী শরীয়তউল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০)। যদিও তারা একই সময়ের মানুষ নন, একই ভূখণ্ডের সন্তানও নন; তাদের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণও নেই। তবু তাদের জীবন পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, ইতিহাস যেন ভিন্ন দুই আকাশের নিচে একই প্রশ্ন উচ্চারণ করেছিল—ধর্ম কি কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নাকি অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ানোরও এক নৈতিক শক্তি?

যখন শাসকের প্রাসাদ উঁচু হয়, অথচ সাধারণ মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকে।

আরও পড়ুন: ফ্লোরিডায় ব্যবসায়িক বিমান বিধ্বস্ত, ৯ জন নিহত

পশ্চিম আফ্রিকার হাউসাল্যান্ডে তখন রাজ্যগুলোর শাসন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, করের বোঝা এবং ধর্মীয়-সামাজিক অসন্তোষ মানুষের জীবনকে আলোড়িত করছিল। সেই বাস্তবতার ভেতর থেকে উঠে এলেন উসমান দান ফোদিও—একজন ধর্মীয় পণ্ডিত, শিক্ষক ও সংস্কারক। তিনি কেবল মানুষের সামনে ধর্মের কথা বলেননি; শাসকের আচরণকেও ধর্মীয় ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিচার করেছিলেন। তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে এমন মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠল, যারা বিদ্যমান ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল।

এদিকে বাংলার আকাশেও জমছিল অন্য মেঘ। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর জমিদারি ব্যবস্থায় কৃষকের ওপর খাজনার চাপ, ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তৃত্ব এবং গ্রামীণ সমাজের নানা সংকট ক্রমে গভীর হয়ে উঠছিল। এই বাস্তবতার মধ্যে হাজী শরীয়তউল্লাহর আবির্ভাব। দীর্ঘ ধর্মীয় শিক্ষালাভের পর তিনি বাংলার মানুষের কাছে ফিরে এলেন নতুন এক আহ্বান নিয়ে—ধর্মকে ফিরিয়ে আনতে হবে তার মৌলিক বিধানে, জীবনকে মুক্ত করতে হবে তার দৃষ্টিতে ধর্মবিরোধী আচার ও কুসংস্কার থেকে।

একজনের সামনে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার রাজশক্তি ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রশ্ন; অন্যজনের সামনে ছিল বাংলার ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদারি ও ঔপনিবেশিক সমাজের কঠিন বাস্তবতা। একজনের কণ্ঠ উঠেছিল হাউসাল্যান্ডে, অন্যজনের কণ্ঠ বাংলার জনপদে—কিন্তু দুজনের ইতিহাসেই সাধারণ মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নটি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তলোয়ার ওঠার আগে জেগে উঠেছিল চিন্তা

আরও পড়ুন: বাইন্যান্স থেকে ৬০০ কোটি ডলার চুরি করেছে উত্তর কোরিয়ার ‘ট্রেডারট্রেইটর’: এফবিআই

প্রতিটি বড় পরিবর্তনের আগে মানুষের মনে একটি প্রশ্ন জন্ম নেয়। যে প্রশ্ন একদিন চাপা স্বরে উচ্চারিত হয়, কালক্রমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে জনসমাজের সম্মিলিত কণ্ঠ।

উসমান দান ফোদিওর আন্দোলনের গোড়ায় ছিল শিক্ষা, ধর্মীয় প্রচার ও শাসকদের নীতির সমালোচনা। আনুমানিক ১৭৭৪–১৭৭৫ সাল থেকে তিনি সক্রিয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রচার চালাতে থাকেন। তার বক্তব্যে ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে শাসকদের আচরণের অসংগতি এবং সমাজের প্রচলিত কিছু রীতির সমালোচনা উঠে আসে। অনুসারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আন্দোলনও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্জন করে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহর হাতে গড়ে উঠল ফরায়েজী আন্দোলন। ‘ফরায়েজী’ শব্দটি এসেছে ‘ফরজ’ থেকে—যে কর্তব্য পালন করা অবশ্যকর্তব্য। তার আহ্বান ছিল, মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে ফরজ বিধানকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং তার বিবেচনায় ইসলাম বহির্ভূত রীতিনীতি পরিহার করতে হবে। প্রায় ১৮১৮ সালে বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর তার সংস্কার প্রচেষ্টা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের হাতে প্রথম অস্ত্র ছিল শিক্ষা, বক্তব্য ও সংগঠন। তারা মানুষের চিন্তাজগতে পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন; কারণ মানুষ যখন নিজের অবস্থাকে নতুন করে বুঝতে শেখে, তখনই পুরোনো ব্যবস্থার ভিতরে প্রশ্নের জন্ম হয়। এখানেই দুই নেতার ইতিহাসের এক গভীর সাদৃশ্য—পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার আসনে আঘাত করে আসে না; কখনো তা শুরু হয় মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে।

আরও পড়ুন: চীনের শীর্ষ ধনী নারী হলেন লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা ঝোউ চুনফেই

যখন সংস্কারের ভাষা এসে দাঁড়ায় ক্ষমতার মুখোমুখি।

কিন্তু ইতিহাসের পথ সব সময় শান্ত থাকে না। যখন কোনো আন্দোলন প্রচলিত কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করে, তখন সেই প্রশ্নের উত্তর সব সময় যুক্তি দিয়ে আসে না; কখনো আসে সংঘাতের মধ্য দিয়ে।

১৮০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উসমান দান ফোদিও তার অনুসারীদের নিয়ে গুদুতে হিজরত করেন। হাউসা শাসকদের সঙ্গে তার বিরোধ তখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে তিনি সশস্ত্র জিহাদের নেতৃত্ব দেন। ১৮০৮ সালে গোবিরের রাজধানী আলকালাওয়া দখল তার আন্দোলনের সামরিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহর আন্দোলনও ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডি অতিক্রম করে সামাজিক-অর্থনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হয়। জমিদারদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘাতের পেছনে ছিল ধর্মীয় আচার, কর্তৃত্ব এবং কৃষকদের ওপর আরোপিত বিভিন্ন আদায়ের প্রশ্ন। তার আন্দোলন সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নতুন সংগঠিত চেতনা সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন: এপস্টেইনকাণ্ডে আইনি লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প

তবে দুটি ইতিহাসকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। উসমান দান ফোদিওর আন্দোলন সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবদ্দশায় ফরায়েজী আন্দোলনের প্রধান পরিচয় ছিল ধর্মীয় সংস্কার; পরবর্তী সময়ে তার ছেলে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে কৃষকসংগঠন ও জমিদারবিরোধী প্রতিরোধ আরো সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে।

ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় সংস্কার যখন সমাজের ক্ষমতাকাঠামোকে স্পর্শ করে, তখন তার অভিঘাত উপাসনালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের ভূমি, জীবিকা, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নেও পৌঁছে যেতে পারে।

আফ্রিকার মাটিতে রাষ্ট্র, বাংলার মাটিতে আন্দোলনের উত্তরাধিকার।

উসমান দান ফোদিওর আন্দোলনের পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। তার নেতৃত্বে শুরু হওয়া সংগ্রাম থেকে গড়ে ওঠে সোকোতো খিলাফত, যা পরবর্তী সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৮১৭ সালে তার মৃত্যু হলেও তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রভাব বহু দশক ধরে বিস্তৃত ছিল।

আরও পড়ুন: ২০২৭ সালে ইসলামী বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী তুর্কিস্তান ঘোষণা

এই আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি উজ্জ্বল নাম তার কন্যা নানা আসমাউ (১৭৯৩–১৮৬৪/৬৫)। তিনি ছিলেন পণ্ডিত, কবি ও শিক্ষিকা। নারীশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার কাজ প্রমাণ করে, একটি সংস্কারমূলক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজের চিন্তাজগতেও প্রবাহিত হতে পারে।

বাংলায় হাজী শরীয়তউল্লাহ কোনো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। কিন্তু তার মৃত্যুর সঙ্গে ফরায়েজী আন্দোলনের ইতিহাস থেমে যায়নি। তার ছেলে দুদু মিয়া (১৮১৯–১৮৬২) আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদারদের সঙ্গে সংঘাতে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

একজনের উত্তরাধিকার পশ্চিম আফ্রিকায় একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল; অন্যজনের উত্তরাধিকার বাংলায় ধর্মীয় সংস্কার থেকে কৃষক প্রতিরোধের বিস্তৃত ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল। দুই জীবনের সাফল্য তাই একই মাপকাঠিতে মাপা যায় না। একজনের ইতিহাসে আছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধ্যায়, অন্যজনের ইতিহাসে আছে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়া এক সংস্কার আন্দোলনের বীজ।

ইতিহাসের আয়নায় দুই মানুষ

আরও পড়ুন: সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়াতে চলছে নীরব কূটনীতি

তাহলে, কী আমাদের উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহকে পাশাপাশি দাঁড় করাতে শেখায়? তারা এক ছিলেন না। তাদের সময় এক ছিল না, সংগ্রামের ধরনও এক ছিল না। তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ নেই। কিন্তু তাদের জীবন আমাদের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলো কোনো একটি ভূখণ্ডের জন্য নির্দিষ্ট নয়।

যখন ধর্মীয় আদর্শ ও শাসকের আচরণের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়, তখন কে সেই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলবে? যখন সাধারণ মানুষ প্রচলিত ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সংকটে পড়ে, তখন কে তাদের সংগঠিত হতে সাহায্য করবে? আর যখন সংস্কারের আহ্বান সমাজের গভীরে পৌঁছে যায়, তখন তার পরিণতি কি কেবল বিশ্বাসের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তা নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতারও জন্ম দেয়? উসমান দান ফোদিও ও হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবন আমাদের এসব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।

হাউসাল্যান্ডের প্রান্তর আর বাংলার নদীর চর—দুই ভূগোলের মধ্যে ছিল বিপুল দূরত্ব। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না। সময় বদলায়, শাসকের নাম বদলায়, সমাজের ভাষা বদলায়; তবু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন বারবার ফিরে আসে।

হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর পুনরাবৃত্তি কোনো ঘটনার হুবহু ফিরে আসা নয়; বরং ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভূখণ্ডে মানুষের মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের আবারও জেগে ওঠা। আর সেই কারণেই আফ্রিকার উসমান দান ফোদিও ও বাংলার হাজী শরীয়তউল্লাহকে পাশাপাশি পড়া শুধু অতীতের দুই ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়—এ আমাদের বুঝতে শেখায়, ইতিহাসের দূরত্ব যতই হোক, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো একই সুরে কথা বলে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরির ৯০ শতাংশ পূরণ করল বাইন্যান্স

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩২ এম


৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরির ৯০ শতাংশ পূরণ করল বাইন্যান্স

বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হওয়া ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদের ৯০ শতাংশের ঘাটতি পূরণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বাকি ১০ শতাংশ সম্পদ পুনরায় সংগ্রহ করতে আরও সময় লাগতে পারে।

গত বৃহস্পতিবারের সাইবার হামলাটি ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ চুরির ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। বাইন্যান্স জানায়, চুরির ফলে ব্যবহারকারীদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বহন করবে। ফলে ব্যবহারকারীদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

শনিবার একটি বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, তারা চুরি হওয়া সম্পদের ৯০ শতাংশ পুনরায় সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ সম্পদ তুলনামূলক কম তারল্যসম্পন্ন হওয়ায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ সংগ্রহ করতে বেশি সময় লাগতে পারে।

বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং বলেন, "চুরির কারণে সৃষ্ট ক্ষতি পূরণের প্রতিশ্রুতি তারা শুরু থেকেই দিয়ে আসছেন।" এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল থেকে ৬৩৪ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ রেখেছে।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিটকয়েন, ইথেরিয়াম ও টেথারসহ ১০ ধরনের বহুল লেনদেন হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সির সম্পদের ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। ব্যবহারকারীদের ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বহন করবে এবং তাঁদের ওপর কোনো আর্থিক দায় চাপানো হবে না।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই শনিবার জানিয়েছে, এই সাইবার হামলার জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী। সংস্থাটির দাবি, গত ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্স থেকে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি ভার্চ্যুয়াল সম্পদ চুরির সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এর আগে দুটি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান বিবিসিকে জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটর এই হামলার পেছনে থাকতে পারে। এফবিআইও তাদের বিবৃতিতে গোষ্ঠীটির নাম উল্লেখ করেছে। ট্রেডারট্রেইটর লাজারাস গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হয়। তবে উত্তর কোরিয়া এ ধরনের সাইবার হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে অননুমোদিত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী তদন্তে নিরাপত্তা ভাঙার আরও কয়েকটি পথের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রিচার্ড টেং বলেন, "একাধিক ব্যক্তি এই হামলায় জড়িত ছিলেন। নিজেদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন মুছে ফেলতে তাঁরা ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা’সহ অত্যাধুনিক কৌশল ব্যবহার করেছেন।"

এর আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন অংশীদারের সহযোগিতায় চুরি হওয়া প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করার কথা জানিয়েছিল বাইন্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসও চুরি হওয়া অর্থ শনাক্ত, জব্দ ও উদ্ধারে কাজ করছে।

বর্তমানে ব্যবহারকারীদের জন্য অর্থ উত্তোলনসেবা পুনরায় চালু করাই বাইন্যান্সের প্রধান লক্ষ্য। ১ নভেম্বর থেকে এ সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এর আগে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির ঘটনা ছিল এ ধরনের সবচেয়ে বড় হামলা। ওই ঘটনার জন্যও উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল এফবিআই। তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

নভেম্বর থেকে আমিরাতে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩৩ এম


নভেম্বর থেকে আমিরাতে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত

চার মাস পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে জ্বালানি তেলের দামে স্বস্তি ফিরছে। নভেম্বর মাস থেকে দেশটিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির মাঝেও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশটি।

দ্য ন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নভেম্বর মাসে প্রতি লিটার সুপার ৯৮ পেট্রলের দাম ৪ দশমিক ১৬ দিরহাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবরে এই দাম ছিল ৪ দশমিক ৪০ দিরহাম। এর ফলে দাম কমছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

এছাড়া, স্পেশাল ৯৫ পেট্রলের দাম ৪ দশমিক ২৮ দিরহাম থেকে কমে ৪ দশমিক ০৪ দিরহাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দাম কমবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

ই-প্লাস ৯১ পেট্রলের দাম সবচেয়ে বেশি কমছে। প্রতি লিটারে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে নতুন দাম দাঁড়াচ্ছে ৩ দশমিক ৯৭ দিরহাম। অক্টোবরে এই জ্বালানির দাম ছিল ৪ দশমিক ২১ দিরহাম।

অন্যদিকে, ডিজেলের দাম ১ শতাংশ কমিয়ে প্রতি লিটার ৪ দশমিক ৭৫ দিরহাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অক্টোবরে এর দাম ছিল ৪ দশমিক ৮০ দিরহাম।

তবে, নভেম্বরের এই মূল্যহ্রাসের পরও আমিরাতে জ্বালানির দাম গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম ছিল।

২০১৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমিরাতে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব দেশটির খুচরা বাজারেও পড়ে।

অক্টোবরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৭ দশমিক ৬৪ ডলারে দাঁড়ায়। পুরো মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে পৌঁছায়।

এর আগে বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, নভেম্বরেও আমিরাতে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। দুবাইভিত্তিক ক্বামার এনার্জির পরামর্শক আহমেদ জাহির বলেন, "ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি তেলের দাম বাড়াতে সহায়তা করছে।" তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা, চাহিদা কমে যাওয়া এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তেলের দাম আরও বাড়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন

ইরানে নতুন হামলা চালানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ইসরাইল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩৪ এম


ইরানে নতুন হামলা চালানোর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ইসরাইল

ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশটির সংবাদমাধ্যম ইয়েদিওথ আহরোনোথে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের মোকাবিলায় ইসরাইলের সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনৈতিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইসরাইল ইরানের সঙ্গে আরেক দফা সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু নতুন হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হাতে নেই। ট্রাম্পই নির্ধারণ করবেন, তিনি তেহরানের সঙ্গে চুক্তির পথে এগোবেন, নাকি ইসরাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে আবারও হামলা চালাবেন।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইসরাইলের প্রস্তুতি এখন আর কেবল পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশটির বিমানবাহিনী সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমায় কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ নিয়ে একাধিক মহড়া পরিচালনা করেছে। এসব মহড়ায় ইরানের সীমান্তমুখী সম্ভাব্য হামলার পথ অনুশীলন করা হয়েছে।

ইয়েদিওথ আহরোনোথের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের উপস্থিতিতে ট্রাম্পের কাছে সামরিক অভিযানের বিভিন্ন বিকল্প উপস্থাপন করেন। তবে নতুন হামলা শুরুর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সংবাদমাধ্যমটি দাবি করেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি সামরিক কার্গো বিমান ইসরাইলের বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে। এসব বিমান মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন অভিযানের প্রস্তুতিও অব্যাহত রেখেছে।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় সমস্যা হলো সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণের অভাব। তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতায় বিমান হামলা চালানো হলে দেশটির সরকার পতন হবে কিংবা নীতিতে পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

সূত্রগুলোর ধারণা, ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনে যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে চুক্তি করতে বাধ্য করার চাপ হিসেবেও সামরিক হামলার হুমকি ব্যবহার করা হতে পারে।

তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরাইলের উদ্বেগের সমাধান না করে কোনো চুক্তি হলে দেশটির নিরাপত্তাসংক্রান্ত আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া সংঘাত নতুন করে শুরু হলে লেবাননেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগের মতো হিজবুল্লাহ এতে যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মজুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সূত্রগুলো।

সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও এগোচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। এসব আলোচনার লক্ষ্য সরাসরি আলোচনার পথ তৈরি করা।

সম্ভাব্য আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি এবং তেহরানকে দেওয়া অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। এ ছাড়া কোনো চুক্তি হলে চীন ও রাশিয়া এর নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ইসরাইলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া নয়; বরং সামরিক অভিযান হলে সেটি যেন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার স্বার্থে কাজে আসে, তা নিশ্চিত করা। এজন্য অভিযানের লক্ষ্য, যুদ্ধ বন্ধের শর্ত এবং প্রত্যাশিত ফলাফল আগে থেকেই স্পষ্ট করা জরুরি।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরে এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে আলোচনা থমকে যাওয়ার মধ্যে জুলাইয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

‘দার–এ–নিজাত’: প্রেম, প্রতারণা ও নতুন জীবনের গল্পে দর্শকদের উন্মাদনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিনোদন ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩৫ এম


‘দার–এ–নিজাত’: প্রেম, প্রতারণা ও নতুন জীবনের গল্পে দর্শকদের উন্মাদনা

শৈশবের বন্ধুত্ব, প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ এবং নতুন করে জীবন শুরু করার কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার–এ–নিজাত’। ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘাতের এই গল্পটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালেও সিরিজটি নিয়ে আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ এবং অভিনয়শিল্পীদের প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে। ধারাবাহিকটির দর্শনসংখ্যা নিয়ে চমকপ্রদ তথ্যও সামনে এসেছে।

পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল এআরওয়াই ডিজিটালের দাবি, মাত্র ২৩ পর্ব প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘দার–এ–নিজাত’ ১৭০ কোটির বেশি ভিউ অর্জন করেছে। গত ২৪ অক্টোবর চ্যানেলটি এই সাফল্যের কথা জানায়। তাদের দাবি, এত অল্প পর্বে বিপুল দর্শনসংখ্যা অর্জন করে পাকিস্তানি ধারাবাহিকের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে সিরিজটি। প্রধান অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ ও নতুন সম্পর্কের গল্প

‘দার–এ–নিজাত’-এর কাহিনীর কেন্দ্রে রয়েছে জারিয়াব, জামিল ও আবু বকর। জারিয়াব একজন প্রাণবন্ত তরুণী, যিনি নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থেকে জামিলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। এই সম্পর্ক জারিয়াবের কাছে কেবল ভালোবাসার নয়, বরং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতিও।

কিন্তু গল্পের মোড় ঘুরে যায় যখন জামিল নিজের জীবন ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি জারিয়াবকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন জারিয়াব, তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়া তরুণীর বিশ্বাসে বড় আঘাত হানে।

এরপর জারিয়াবের জীবনে আবু বকর আসেন। শেহরিয়ার মুনাওয়ার অভিনীত এই চরিত্রের সঙ্গে জারিয়াবের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গল্পে নতুন মাত্রা যোগ হয়। অতীতের ক্ষত কাটিয়ে ওঠা, নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করা এবং জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সংগ্রাম কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

ফলে ‘দার–এ–নিজাত’ কেবল প্রেমে বিচ্ছেদের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর একজন মানুষ কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন, সেই প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

জামিলের সিদ্ধান্তে দর্শকদের ক্ষোভ

ধারাবাহিকটির আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম জামিলের আচরণ। দীর্ঘদিনের প্রেমের পর জারিয়াবকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। বিশেষ করে জারিয়াবকে যথেষ্ট ধার্মিক মনে না করার কারণে তাঁর কাছ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়টি দর্শকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

জামিলের সিদ্ধান্ত ঘিরে দর্শকদের প্রশ্ন, ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার অধিকার সবারই রয়েছে। কিন্তু নিজের পরিবর্তিত বিশ্বাসের মানদণ্ডে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে বিচার করে সম্পর্ক থেকে সরে যাওয়া কতটা যৌক্তিক?

অনেক দর্শকের কাছে জামিলের আচরণ দ্বিচারিতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁর সিদ্ধান্ত ও দুর্বলতা চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। কারণ, বাস্তব জীবনেও ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সামাজিক প্রত্যাশা ও আবেগের সংঘাতে মানুষ কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যার পরিণতি অন্যের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে।

চরিত্রটির প্রতি দর্শকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া তাই ধারাবাহিকটির আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দর্শকেরা শুধু পরবর্তী পর্বে কী ঘটবে, তা জানতে চাইছেন না; একই সঙ্গে চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়েও আলোচনা করছেন।

অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক

প্রেমের সম্পর্কের উপস্থাপন নিয়েও আলোচনা এসেছে ‘দার–এ–নিজাত’। জারিয়াব ও জামিলের সম্পর্কের একটি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়।

একটি পর্বে জারিয়াব জামিলের বাড়িতে যাওয়ার পর গল্প এগিয়ে যায় পরদিন সকালের ঘটনায়। এরপর চরিত্রগুলোর আচরণ ও জারিয়াবের সঙ্গে তাঁর দাদির কথোপকথন থেকে তাঁদের মধ্যে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেন দর্শকেরা।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক দর্শক লেখক উমেরা আহমেদের কাছে জানতে চান, দৃশ্যটির মাধ্যমে কি জারিয়াব ও জামিলের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে? উত্তরে উমেরা সংক্ষেপে ‘হ্যাঁ’ বলেন।

ঘটনাটি নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। এক পক্ষের মতে, সরাসরি কিছু না দেখিয়েও দৃশ্যটির মাধ্যমে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ পারিবারিক দর্শকের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এই বিতর্ক থেকে বোঝা যায়, দর্শকেরা এখন শুধু গল্পের বাঁক বা অভিনয় নিয়ে নয়, সম্পর্কের উপস্থাপন এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়েও মতামত দিচ্ছেন।

উমেরা আহমেদের গল্প, অভিনয়ে শেহরিয়ার ও দুরে–ফিশান

‘দার–এ–নিজাত’ লিখেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার ও ঔপন্যাসিক উমেরা আহমেদ। সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি তাঁর লেখার পরিচিত বিষয়। ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’ ও ‘মেরি জাত জাররা–এ–বিনিশান’-এর মতো কাজের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন।

ধারাবাহিকটি পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। প্রযোজনায় রয়েছে থ্রিজ এন্টারটেইনমেন্ট। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেহরিয়ার মুনাওয়ার, দুরে–ফিশান সেলিম ও নামির নওয়াজ খান। এ ছাড়া অভিনয় করেছেন সাহার হাশমি, রোমাইসা খান, সানিয়া সাঈদ, সাবা হামিদ, ফারান তাহির, আদনান জাফর ও নাদিয়া আফগানসহ অনেকে।

জারিয়াব চরিত্রে দুরে–ফিশান সেলিমের অভিনয় নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। কেউ তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির আবেগ, দ্বিধা ও মানসিক টানাপোড়েনের প্রকাশের প্রশংসা করেছেন। আবার কেউ সংলাপ বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

অন্যদিকে আবু বকর চরিত্রে শেহরিয়ার মুনাওয়ারের উপস্থিতি দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। জারিয়াবের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নতুন দিকগুলো সামনে আসার পর চরিত্রটি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। নামির নওয়াজ খানের অভিনীত জামিল চরিত্রটিও দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে।

বাংলাদেশেও কেন আগ্রহ?

পাকিস্তানি ধারাবাহিকের প্রতি বাংলাদেশের দর্শকদের আগ্রহের পেছনে রয়েছে পারিবারিক গল্প, প্রেমের জটিলতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটকীয় দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার ভূমিকা। ‘দার–এ–নিজাত’-এর কাহিনিতেও এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা ভাষা ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।

ভালোবাসার সম্পর্কে প্রত্যাশা, পরিবার ও সমাজের চাপ, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সংঘাত এবং বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা-এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও পরিচিত।

এ ছাড়া চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও বিতর্ক ধারাবাহিকটির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। দর্শকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চরিত্রগুলোর আচরণ বিচার করছেন। ফলে সিরিজটি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনারও উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত বদলাবে কার অবস্থান?

‘দার–এ–নিজাত’-এর গল্পে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অতীতের সম্পর্কের ক্ষত এবং নতুন করে বিশ্বাস গড়ে তোলার লড়াই। জারিয়াব কি আবু বকরের সঙ্গে নতুন জীবনে স্থিতি খুঁজে পাবেন? জামিল কি নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি উপলব্ধি করতে পারবেন? আর ভালোবাসা, অনুশোচনা ও ক্ষমার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত বদলাবে কার অবস্থান?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে দর্শকেরা অপেক্ষায় রয়েছেন। ২৩ পর্বেই ১৭০ কোটির বেশি ভিউয়ের দাবি যেমন ধারাবাহিকটিকে আলোচনায় এনেছে, তেমনি প্রেম, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সম্পর্কের নৈতিকতা নিয়ে এর গল্পও তৈরি করেছে বাড়তি আগ্রহ।

সূত্র: জিও নিউজ ও এআরওয়াই নিউজ।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৮
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:১৯
ইশা ০৬:৩১
সূর্যোদয় : ০৬:০৫ সূর্যাস্ত : ০৫:১৯
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%