০৫:৩৭ এম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দিনটি গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে স্মরণ করা হবে। এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শহীদ হন চরফ্যাশন উপজেলার ১২ যুবক। এঁরা সকলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এঁরা ছিলেন কলেজ-মাদ্রাসাছাত্র, দিনমজুর, রিকশা ও ভ্যানচালক এবং হোটেল কর্মচারী। জীবনের অভাব দূর করার আশায় রাজধানীতে পানিপ্রবাহ করে জীবনের চাওয়া নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু একে একে প্রাণ হারান ১২ জন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ঘরে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে। সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, এই আন্দোলনে এতো প্রাণ অন্য কোনো উপজেলাবাসীর মধ্যে যেন ঘটেনি।
চরফ্যাশন উপজেলার ইউএনও, সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদদের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিহত ১২ জনের মধ্যে রয়েছেন- ফুটপাতের দোকানি মো. সিয়াম (১৫), বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রাকিব মোল্লা (২৫), কোম্পানির বিপণনকর্মী মো. সোহাগ (১৭), রাজমিস্ত্রি মো. বাহাদুর হোসেন মনির (১৮), গার্মেন্টস কর্মী মো. ফজলু (২৮), রাজমিস্ত্রি মো. ফজলে রাব্বি (২০), ইন্টারনেট কর্মী মো. হাসনাইন (২৫), কলেজ শিক্ষার্থী মো. মমিন (১৯), ট্রাক চালক মো. হোসেন (২৫), দোকান কর্মচারী মো. হাবিবুর রহমান (২৯), মুদি দোকানের কর্মচারী মো. ওমর ফারুক (১৬) এবং দর্জি মো. তারেক (১৮) রয়েছে।
আরও পড়ুন: ফের খুলনায় গুলিতে যুবক নিহত, ঘটনাস্থলে নম্বরপ্লেটবিহীন আর-১৫ বাইক
স্বজনদের বিলাপ এখনও গগনে ভাসছে। ৫ আগস্ট তাদের জন্য এক বিভীষিকাময় দিন। ঘটনা ঘটার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের পরিবার এই শোক ভুলতে পারে নি। সেদিনে কেউ বাবা হারিয়েছেন, কেউ ভাই, আবার কেউবা সন্তানকেও। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার আজ কঠিন সংকটে পড়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। জীবিকার সন্ধানে শহরে যাওয়া এই মানুষগুলো ফিরতে পারেননি। তারা রয়ে গেছে শুধুমাত্র স্মৃতিতে। ঘাতকদের গুলির আঘাতে নির্মমভাবে শহীদের দাফন সম্পন্ন হয় নিজ নিজ পরিবারের কবরস্থানে। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার প্রধান আসামি দেশের সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবুও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হতে চললেও হত্যাকারীদের বিচার না হওয়ায় স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
কেমন আছেন শহীদদের পরিবারের সদস্যরা? চরফ্যাশন উপজেলার জাহানপুর ইউনিয়নের আটকপাট গ্রামের শহীদ ফজলুর রাব্বির স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, "স্বামী বলছিলো আর ঢাকায় থাকব না, বাড়ি গিয়ে একটু জমি কিনে নতুন ঘর করব। মেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাবো। আমার ছোট মেয়ে এখন কোন দিকে যাবে? কাকে বাবা বলে ডাকবে।" ঢাকার মিরপুর ১৩ নম্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত গার্মেন্টস কর্মী ফজলুর রহমানের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারিয়ে ৭ মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন দুর্ভোগে রয়েছেন।
উপজেলার দুলারহাট থানার নীলকমল ইউনিয়নের মো. হোসেনের (২৫) মা রিনা বেগম জানান যে, ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত ৩টার সময় রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার চাঁদ উদ্যানের গেটে শিক্ষার্থী-পুলিশের সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মো. হোসেন।
আরও পড়ুন: বাগাতিপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহরিয়ার মাহমুদ স্বাধীন বহিষ্কার
রিনা বেগম বলেন, "আমার স্বামীর মৃত্যু পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে কাজের উদ্দেশ্যে ঢাকাতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে ইট বেঁচে টাকা উপার্জন করে সংসার চালিয়েছি। ছেলে ট্রাক চালাতো। তার দুই সন্তান আছে। সম্পর্কের সঙ্কট চলছে; আমি কীভাবে বাচাঁবো? দুই নাতনি এবং পুত্রবধূকে নিয়ে কোথা থেকে কিভাবে বাঁচবো?"
উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের তারেক গত ৫ই আগস্ট সকাল ১১টায় নাস্তা করে টেইলরস এ যাওয়ার সময় বেলা ১২টা ৩৭ মিনিটের পরে সহকর্মীরা তার ফোন বন্ধ পান। তারেককে না পেয়ে সন্দেহে ঢাকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে সমস্ত বেওয়ারিশ লাশের ছবি তুলে স্বজনদের কাছে পাঠান। ছবিটি দেখে তারেকের মরদেহ শনাক্ত করেন তার বাবা মো. রিয়াজ। তিনি বলেন, "আমি এক ছেলে পেয়ে আল্লাহর কাছে বেশ খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমার বুক থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। আজ দুই বছর হয়ে গেল, বাবার মুখটা দেখি না। মনে হয়ঢাকা থেকে বাড়িতে কাছে আসবে; আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।"
চরফ্যাশনের নুরাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর তোফাজ্জল গ্রামের শহীদ ওমর ফারুকের মা ইয়ানুর বেগমের কান্না এখনও থেমে যায়নি। সন্তানহারা এই মা এখন শোকে কাতর। তিনি ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কেঁদে চলেছেন। তাঁর সন্তান তিনজনের মধ্যে শহীদ ওমর ফারুক দ্বিতীয়। অভাবের কারণে প্রায় ৫ বছর আগে ঢাকায় পাড়ি জমানোর ঘটনা ঘটে। ওমর ফারুক একটি দোকানে কর্মচারী ছিলেন। তারা রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আটকে অবস্থান করত। সবাই মিলে কাজ করায় তাদের সংসার ভালো চলছিল। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে ১৬ বছরের কিশোর ওমর ফারুক। ৪ আগস্ট ওমর ফারুক মোহাম্মদপুরের ওভারব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে সন্তানহারা মা ইয়ানুর বেগম আজও সন্তানের কথা ভুলতে পারেন না।
চরফ্যাসন উপজেলার জাহানপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সেলিম মাঝির ছেলে ছিল পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। মাত্র চার মাস আগে ২০ বছর বয়সে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। দুই মাস পর নতুন সংসার ছাড়তে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলাকায় বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজে যোগ দেন। নববধূকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন শাড়ি নিয়ে আসার। কিন্তু ফেরা হলো না তার। ঘাতকের বুলেট সেই জীবনের সুযোগ কেড়ে নিল। গুলিবিদ্ধ মো. রাব্বির মা জয়তুন বেগম। বাড়িতে গিয়ে শহীদ রাব্বির খোঁজ নিতে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এইভাবে চরফ্যাশনের শহীদ পরিবারগুলোতে চলছে কান্না ও আহাজারি। কেউ স্বামী হারিয়ে, কেউ সন্তান হারিয়ে। এই কান্না যেন থামার নয়।
আরও পড়ুন: বোয়ালখালীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আ. লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৩ নেতা গ্রেপ্তার
শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ সিয়ামের ভাই বলেন, শহীদরা তাঁদের রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে যে বৈষম্যহীন কাঙ্ক্ষা বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল, তা হয়নি। সেই বৈষম্য রয়ে গেছে। সরকারের কাছে আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা হলো- বিচার চাই। চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজ জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছেন ভোলার সন্তানরা। এর মধ্যে চরফ্যাশন উপজেলার ১২ জন। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তবুও সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। চরফ্যাশন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন