০৫:৫১ এম
কুড়িগ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শাপলা চত্বর ভাঙার ঘটনায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শহীদ মিনার চত্বর সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার। এটি কুড়িগ্রামকে চেনার ক্ষেত্রে একটি আইকনিক স্থাপনা। এই স্থাপনাটির সৌন্দর্য সকলকে বিমোহিত করে। কিন্তু উন্নয়নের বিকল্প পথ না খুঁজে মুছে ফেলা হচ্ছে জেলা শহরের ঐতিহ্যকে।
কুড়িগ্রাম শহরের শাপলা চত্বর এলাকায় যানজট নিরসনের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে একটি অংশ অপসারণের কাজ শুরু করেছে সড়ক বিভাগ। বৃহস্পতিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম পৌরসভা এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের যৌথ উদ্যোগে শহরের জিরো পয়েন্টে এ কাজের শুরু হয়। তবে শহীদ মিনারের অংশ ভাঙা নিয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও শাপলা চত্বর কুড়িগ্রাম-রংপুর এবং কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত। প্রশাসনের মতে, মোড়টি সরু হওয়ায় বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে অটোরিকশা, বাস ও ট্রাকের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে যায়। এতে যানজটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বৃদ্ধি পায়। তাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জনগণের দুর্ভোগ নিরসনের জন্য।
আরও পড়ুন: ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’-আলফাডাঙ্গা সদর ইউনিয়নে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও আর্থিক সহায়তা প্রদান কামরুল ইসলাম দাউদের
সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, যানজট নিরসনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের প্রায় ১৫ ফুট অংশ অপসারণ করা হবে। এতে ওই মোড়টি প্রশস্ত হবে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। তিনি আরও বলেন, শহীদ মিনার একটি সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সকল রাজনৈতিক দল ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সওজ কেবল নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজ করছে।
কাজ পরিদর্শন করতে গিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, শাপলা চত্বর দীর্ঘদিন ধরে শহরের যানজটের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি বলেন, শহীদ মিনারের মূল স্তম্ভ অক্ষত রেখে শুধু অব্যবহৃত এবং অনাবশ্যক অংশ অপসারণ করা হচ্ছে, যাতে সড়ক প্রশস্ত করা যায়। এতে শহরের কেন্দ্রস্থলে যান চলাচল আরও গতিশীল হবে বলেও তিনি আশাবাদী।
কাজ শুরুর সময় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক হাসিবুর রহমান হাসিব, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক মুকুল মিয়া এবং সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অটোরিকশাচালক মাইদুল ইসলাম বলেন, শাপলা চত্বরে পৌঁছালে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট আটকে থাকতে হতো। মোড়টি বড় হলে সময় বাঁচবে। তবে যদি শহীদ মিনারের ক্ষতি না করে কাজটি করা যায় তাহলে সেটি ভালো হবে।
আরও পড়ুন: টেকনাফে সুপারি বাগান থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ, এলাকায় আতঙ্ক
এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, শাপলা চত্বরসংলগ্ন রেলওয়ের খাসজমির অধিগ্রহণ এবং আশপাশের দোকানপাট উচ্ছেদ করেও সড়ক প্রশস্ত করার সম্ভাবনা ছিল।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সভাপতি সামিউল হক নান্টু জানান, এ ঘটনা দুঃখজনক। তিনি কুড়িগ্রামের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ জানান। রাস্তা সম্প্রসারণের অনেক বিকল্প পথ রয়েছে। শহীদ মিনারের মতো সেনসেটিভ ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষায় সরকারকে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এ শহীদ মিনার স্থাপনের পেছনে রয়েছে অনেক লড়াই ও সংগ্রামের ইতিহাস। ইতিহাস বদলানো বা মুছে ফেলা উচিত নয়।
রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, কুড়িগ্রাম জেলা শাখার সহসভাপতি সুব্রতা রায় বলেন, শহীদ মিনারের অংশ ভেঙে রাস্তা প্রশস্ত করা গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। প্রয়োজন হলে আশপাশের জমি অধিগ্রহণ করতে হবে অথবা দোকানপাট সরিয়ে সড়ক সম্প্রসারণ করতে হবে। তাঁর মতে, শহীদ মিনারের জায়গা সংকুচিত করে সড়ক সম্প্রসারণ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পৌরসভার প্রশাসক বি এম কুদরত-এ-খুদার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাই তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল অটোরিকশাচালক সাদেক মিয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন